ব্যাটারি নিরাপত্তায় যুগান্তকারী আবিষ্কার: অতিরিক্ত গরমে তরল ইলেক্ট্রোলাইট কঠিন হয়ে যায়
চীনা বিজ্ঞানীরা একটি নতুন ধরনের তরল ইলেক্ট্রোলাইট তৈরি করেছেন, যা ব্যাটারি অতিরিক্ত গরম হলে মুহূর্তেই কঠিন হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাটারির ভেতরে এক ধরনের 'ফায়ারওয়াল' তৈরি হয়, ফলে সম্ভাব্য বিস্ফোরণ বা আগুন লাগার ঝুঁকি শুরুর আগেই বন্ধ হয়ে যায়। সম্প্রতি এই গবেষণার ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার এনার্জিতে প্রকাশিত হয়েছে।
ব্যাটারির 'থার্মাল রানওয়ে' সমস্যার সমাধান
গবেষকদের মতে, বাণিজ্যিক আকারের সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে এই প্রযুক্তির প্রথম সফল প্রয়োগ এটি। এই আকারের ব্যাটারি সাধারণত স্মার্টফোন বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে ব্যবহৃত হয়। ব্যাটারিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো 'থার্মাল রানওয়ে', যেখানে ব্যাটারির তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে বিস্ফোরণ বা আগুন লাগতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা ছিল যে ব্যাটারির আগুন মূলত তরল ইলেক্ট্রোলাইটের কারণে হয়, তাই গবেষকেরা আগুন না ধরার মতো তরল তৈরির দিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
আসল সমস্যা শনাক্ত ও সমাধান
তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, আগুন প্রতিরোধী তরল থাকলেও অনেক সময় ব্যাটারিতে বিপজ্জনক তাপ প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে। গবেষকেরা জানতে পারেন যে আসল সমস্যা হয় ব্যাটারির ভেতরের পাতলা প্লাস্টিক ঝিল্লি বা সেপারেটর গলে গেলে। তখন ব্যাটারির ধনাত্মক ও ঋণাত্মক অংশের মাঝে শর্ট সার্কিট তৈরি হয়। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ 'পলিমারাইজেবল' ইলেক্ট্রোলাইট তৈরি করেছেন। এটি এমন এক ধরনের তরল, যা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় দ্রুত শক্ত প্লাস্টিকে পরিণত হয়।
ইলেক্ট্রোলাইটের গঠন ও কার্যপ্রণালী
ইলেক্ট্রোলাইটে দুটি সোডিয়াম লবণ ব্যবহার করা হয়েছে—সোডিয়াম টেট্রাফ্লুরোবোরেট এবং সোডিয়াম হেক্সাফ্লুরোফসফেট। এগুলো ব্যাটারির ইলেক্ট্রোডে সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে এবং ব্যাটারির স্থায়িত্ব বাড়ায়। ব্যাটারির তাপমাত্রা প্রায় ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে গেলেই তরল ইলেক্ট্রোলাইট দ্রুত শক্ত হয়ে যায়। আর তখনই ধনাত্মক ও ঋণাত্মক ইলেক্ট্রোডের মধ্যে সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়, যা বিস্ফোরণ রোধ করে।
পরীক্ষার ফলাফল ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা
এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করতে গবেষকেরা দুটি পরীক্ষা চালান। প্রথম পরীক্ষায় ব্যাটারিতে ইস্পাতের পেরেক ঢুকিয়ে শর্ট সার্কিট তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় পরীক্ষায় ব্যাটারিকে ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ওভেনে রাখা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই কোনো ধোঁয়া, আগুন বা বিস্ফোরণ দেখা যায়নি। গবেষণায় যুক্ত বিজ্ঞানী হু ইয়ংশেং জানান, পরীক্ষাগুলো ছোট পরীক্ষাগারের ব্যাটারিতে নয়, বরং ভোক্তা ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রে ব্যবহৃত আকারের ব্যাটারিতে করা হয়েছে। এতে বোঝা যায় প্রযুক্তিটি দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
ব্যাটারির কার্যক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
তিনি বলেন, এই নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যাটারির কার্যক্ষমতা কমায় না। ব্যাটারিটি মাইনাস ৪০ ডিগ্রি থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে। বর্তমানে বাজারে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বেশি ব্যবহৃত হলেও সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারির কিছু বাড়তি সুবিধা রয়েছে। লিথিয়াম একটি সীমিত ও ব্যয়বহুল সম্পদ, যা অনেক দেশে আমদানি করতে হয়। অন্যদিকে সোডিয়াম সহজলভ্য এবং সস্তা। শক্তি ঘনত্বের দিক থেকে সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এখনো লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে, তবু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ গ্রিড ও বাণিজ্যিক যানবাহনে এই প্রযুক্তির বড় সম্ভাবনা রয়েছে।



