গবেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্রুত ও সাবলীল উত্তর দিয়ে মানুষের কাজ সহজ করলেও একটি নতুন মানসিক ঝুঁকি তৈরি করছে। এআইয়ের সবচেয়ে বড় ফাঁদ ভুল তথ্য নয়, বরং এমন আত্মবিশ্বাস তৈরি করা যাতে মানুষ ভুল উত্তরকেও সহজেই সঠিক বলে বিশ্বাস করে বসে। মনোবিজ্ঞানভিত্তিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রযুক্তির প্রতিটি বড় পরিবর্তনের মতো এআইয়ের ক্ষেত্রেও মানুষকে নতুনভাবে মানিয়ে নিতে হবে। শুধু দ্রুত উত্তর পেলেই সেটিকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়; বরং নিজের বিচার-বিবেচনা দিয়ে সেটি যাচাই করা জরুরি।
এআইয়ের শক্তি ও দুর্বলতা
গবেষকদের মতে, এআইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দ্রুত, সাবলীল ও যুক্তিসংগত ভাষায় উত্তর তৈরি করা। কিন্তু সেই উত্তর সবসময় নির্ভুল, পূর্ণাঙ্গ বা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সমস্যা হলো, উত্তরটি এতটাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয় যে অনেকেই সেটি যাচাই করার প্রয়োজনই অনুভব করেন না। উদাহরণ হিসেবে গবেষকেরা বলেছেন, আগে কেউ নতুন কোনো রান্নার রেসিপি জানতে চাইলে অভিজ্ঞ রাঁধুনির লেখা বা বহু মানুষের পরীক্ষিত নির্দেশনা অনুসরণ করতেন। এখন এআই মুহূর্তেই নতুন রেসিপি তৈরি করে দিতে পারে। কিন্তু যন্ত্রের নিজস্ব কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা, স্বাদ নেওয়া বা রান্না করার সক্ষমতা নেই। তাই বিষয়টি সম্পর্কে ব্যবহারকারীর নিজের জ্ঞান যত কম হবে, এআইয়ের উত্তর যাচাইয়ের প্রয়োজন তত বেশি।
মানসিক প্রবণতা ও পক্ষপাত
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, মানুষের মধ্যে আগে থেকেই একটি মানসিক প্রবণতা রয়েছে—যে ব্যাখ্যাটি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিযুক্ত মনে হয়, সেটিকেই সত্য ধরে নেওয়া। এআই এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, কারণ এটি খুব দ্রুত এবং আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে উত্তর দেয়। এ প্রসঙ্গে মনোবিজ্ঞানী আব্রাহাম মাসলোর ‘গোল্ডেন হ্যামার’ ধারণার উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ, কারও হাতে যদি শুধু একটি হাতুড়ি থাকে, তাহলে তার কাছে সব সমস্যাই পেরেক বলে মনে হবে। একইভাবে, এআই সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ভাবতে পারেন, সব সমস্যার সমাধান এখানেই পাওয়া সম্ভব।
এছাড়া নোবেলজয়ী মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানেম্যানের গবেষণার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি দেখিয়েছিলেন, মানুষের সবচেয়ে বিপজ্জনক মানসিক পক্ষপাতগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। কোনো ব্যাখ্যা যদি বিশ্বাসযোগ্য ও সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়, তাহলে মানুষ প্রায়ই ধরে নেয় সেটিই পুরো সত্য। ফলে কী তথ্য বাদ পড়েছে বা কোথায় ভুল থাকতে পারে, তা খতিয়ে দেখার প্রবণতা কমে যায়।
এআই ব্যবহারে সতর্কতা
তবে গবেষকদের মতে, এআই ব্যবহার না করার কোনো কারণ নেই। বরং এটি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, তথ্য সংগ্রহে এবং দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিশেষ করে যেসব বিষয়ে ব্যবহারকারীর নিজস্ব জ্ঞান সীমিত, সেসব ক্ষেত্রে এআইয়ের দেওয়া তথ্য অন্য নির্ভরযোগ্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা উচিত। গবেষকদের ভাষায়, এআইকে সহকারী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু বিচারক হিসেবে নয়। কারণ প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব এখনও মানুষেরই।



