এআই বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত: বস্তুগত অর্থনীতি
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরবর্তী বড় ধরনের জোয়ার আসতে চলেছে বস্তুগত অর্থনীতিতে। মার্কিন বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। তাদের মতে, শুধু ফ্রন্টিয়ার এআই ল্যাবগুলোর মধ্যেই বিনিয়োগ সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এখন এআইয়ের বড় বড় চুক্তি ও বিনিয়োগের পরবর্তী ঢেউ আসবে কলকারখানা, খনি, সেবা ও তেল উত্তোলনের মতো বাস্তব খাতের হাত ধরে।
৭.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা
গোল্ডম্যান স্যাকসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী কম্পিউট, ডেটা সেন্টার ও বিদ্যুৎসহ এআই অবকাঠামো খাতে প্রায় ৭.৬ ট্রিলিয়ন (৭ লাখ ৬০ হাজার কোটি) ডলার বিনিয়োগ করা হবে। ব্যাংকটি বলছে, বিশ্ব জিডিপিতে সফটওয়্যারের অবদান মাত্র ০.৫ শতাংশের কম, ফলে অর্থনীতির বাকি ‘৯৯.৫ শতাংশ’ অংশই এখন এআইয়ের পরবর্তী সীমানা হিসেবে অপেক্ষা করছে।
শিল্প খাতে এআইয়ের প্রভাব শুরু মাত্র
গোল্ডম্যান স্যাকসের ইন্ডাস্ট্রিয়ালস বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান মার্ক সোরেল বলেন, “শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে এআইয়ের প্রভাব আমরা কেবল দেখতে শুরু করেছি।” বর্তমানে প্রযুক্তি ও শিল্প খাতের ঐতিহ্যগত সীমানাগুলো আবছা হয়ে আসছে। গোল্ডম্যান স্যাকসের টেক, মিডিয়া অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস বিভাগের বৈশ্বিক সহ-প্রধান জুং মিন জানান, এআইয়ের কারণে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এখন অ-প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আরও বেশি যৌথভাবে কাজ করছে।
অটোমেশন নিয়ে আলোচনা এখন ‘কত দ্রুত’
সোরেল বলেন, “উৎপাদন খাতের নির্বাহীদের সঙ্গে আলোচনা এখন আর এআই ব্যবহার করা হবে কি না তা নিয়ে নয়, বরং কত দ্রুত স্বয়ংক্রিয়করণ বা অটোমেশন ছড়িয়ে দেওয়া যাবে তা নিয়ে হচ্ছে।” আগামী এক দশকের দিকে তাকালে অনেকে ধারণা করছেন যে, উৎপাদন লাইনগুলোতে মানুষের চেয়ে রোবটের ওপর নির্ভরতা অনেক বাড়বে, বিশেষ করে বিপজ্জনক কাজগুলোর ক্ষেত্রে।
পুঁজির চ্যালেঞ্জ ও বাজারের বুদবুদ শঙ্কা
অবশ্য এআই প্রযুক্তির অগ্রগতি যতটা দ্রুত হচ্ছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি ততটা দ্রুত জোগাড় হচ্ছে না। কেউ কেউ এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও, অনেকের মনে এআই বাজারের সম্ভাব্য বুদবুদ তৈরি হওয়ার ভয় কাজ করছে। তবে জুং মিন মনে করেন, এআইয়ের চাহিদা মেটাতে কোম্পানিগুলোর নতুন পুঁজির সন্ধান করা একটি সুস্থ লক্ষণ।
পুঁজির কাঠামোগত ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কোন খাতগুলো ভালো করবে আর কোনগুলো থমকে যাবে, তা ইঞ্জিনিয়ারিং বা প্রযুক্তির চেয়ে পুঁজির কাঠামোগত ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি নির্ভর করছে। এই পরিবর্তনগুলো করপোরেট পরিচালনা পর্ষদগুলোর ভেতরে এক ধরনের তাগিদ ও শঙ্কা তৈরি করেছে। সোরেল বলেন, “করপোরেট ক্লায়েন্টদের সঙ্গে আলোচনা করার সময় একটি বিষয় স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তারা বলছেন ‘আমি যদি এখন পদক্ষেপ না নিই, তবে কি পিছিয়ে পড়ব?’”
প্রযুক্তি খাতে এমঅ্যান্ডএ বেড়েছে
ডিলজিক-এর তথ্যের বরাতে গোল্ডম্যান স্যাকস জানায়, ২০২৫ সালে প্রযুক্তি খাতে মার্জার অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন (এমঅ্যান্ডএ) বা কোম্পানি একীভূতকরণ ও ক্রয়ের পরিমাণ ছিল ৩৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালে ইতোমধ্যে বেড়ে ৫৬৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সোরেল জানান, বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম কমে আসায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও এই খাতের চুক্তিগুলোকে মন্থর করতে পারেনি।
এআইয়ের পরবর্তী অধ্যায় সিলিকন ভ্যালির বাইরে
মূল কথা হলো, এআইয়ের পরবর্তী অধ্যায় আর শুধু সিলিকন ভ্যালির ভেতরে বন্দি থাকবে না। গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে, এটি দিন দিন বস্তুগত বা বাস্তব অর্থনীতির ওপর ভর করেই গড়ে উঠবে।



