এআই দিয়ে তৈরি এমপি সেলিমের মদপানের ভুয়া ছবি ভাইরাল
এআই দিয়ে তৈরি এমপি সেলিমের ভুয়া ছবি ভাইরাল

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিমের একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তিনি মদের বোতল সামনে রেখে দেখা যাচ্ছেন। তবে প্রথম আলোর ফ্যাক্ট চেকে দেখা গেছে, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি।

ছবির বর্ণনা ও প্রচার

‘এক বোতল মদ একাই খেয়ে দেশকে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা দিলেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম’—এমন ক্যাপশনে ছবিটি ফেসবুকে ছড়িয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, শাহাদাত হোসেন সেলিম বিছানায় বসে মুঠোফোন দেখছেন, পাশে আরও দুজন ব্যক্তি আছেন এবং তাঁদের মাঝখানে একটি ট্রেতে মদের বোতল, চানাচুর, গ্লাস ও একটি জগসদৃশ বস্তু রাখা রয়েছে।

ফেসবুকে ৭ লাখ ৫৯ হাজার অনুসারী বিশিষ্ট জ্যাকব মিল্টন (Jacob Milton) নামের একটি পেজ থেকে ৭ জুলাই ছবিটি পোস্ট করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, ‘যিনি নিজে নারী আর মদের আসর বসিয়ে আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত থাকেন, সেই বিএনপির এমপি শাহাদাত হোসেন সেলিম (লক্ষ্মীপুর-১, রামগঞ্জ) এখন জনগণকে মাদক নির্মূলের নসিহত দিচ্ছেন! ভণ্ডামির একটা সীমা থাকা উচিত।’ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটিতে প্রায় ৭ হাজার প্রতিক্রিয়া, ৪১৫টি মন্তব্য এবং প্রায় ১ হাজার শেয়ার হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মন্তব্য ও সন্দেহ

মন্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অনেক ব্যবহারকারী ছবিটিকে সত্য ধরে নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে কেউ কেউ ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন। বিভিন্ন পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকেও ছবিটি ব্যবহার করে দাবি করা হয়, সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম মদ্যপান করছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যাচাই ও তথ্য

দাবিটি যাচাই করতে গিয়ে দৈনিক বর্তমান বাংলা ও লক্ষ্মীপুর টিভি-তে প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ৫ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘এআই দিয়ে এমপি সেলিমের ছবি বিকৃত করে প্রচারের অভিযোগে প্রতিবাদ’ শিরোনামে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পরে ৭ জুলাই দৈনিক বর্তমান বাংলা ‘ফেইক ছবি ভাইরালে ক্ষোভ সংসদ সদস্য সেলিমের’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ জুলাই প্রবাসী আরফান খান মাহিম এবং ৬ জুলাই প্রবাসী জসিম উদ্দিন পৃথক ভিডিও বার্তায় যাচাই-বাছাই ছাড়া ছবিটি ফেসবুকে প্রকাশ করার কথা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন।

সংসদ সদস্যের বক্তব্য

সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম ৬ জুলাই নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে আলোচিত ছবিটি নিয়ে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমার একটা ফেক ছবি ফেসবুকে ঘুরছে। উপজেলা এবং পৌর বিএনপি নির্বিকার। বিএনপির সব অঙ্গসংগঠন ও প্রশাসন একেবারেই নির্বিকার। সবাই ব্যালেন্স করে। ধন্যবাদ সবাইকে।’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভুয়া ছবি তৈরি ও চরিত্রহননের প্রবণতা উদ্বেগজনক। এ ধরনের অপপ্রচার বন্ধে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে রাজনীতিবিদদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।’

প্রযুক্তিগত যাচাই

খালি চোখে ছবিটি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ট্রেতে থাকা মদের বোতলের ভেতরে একটি কাচের গ্লাসের অংশ অস্বাভাবিকভাবে ঢুকে রয়েছে। এমন অসামঞ্জস্য সাধারণত এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবিতে দেখা যায়।

যাচাইয়ে ছবিটি ZeroGPT- এআই শনাক্তকারী টুল দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। বিশ্লেষণে ছবিটি ডিজিটালি সম্পাদিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। Google SynthID–এর মাধ্যমে অধিকতর যাচাইয়ে ছবিটির নির্দিষ্ট অংশে ডিজিটাল ওয়াটারমার্কের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। SynthID হলো গুগলের একটি বিশেষায়িত প্রযুক্তি, যা Google AI-এর মাধ্যমে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্টে সংযোজিত অদৃশ্য ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।

সূত্র: তৌসিফ আকবর, সিনিয়র ফ্যাক্ট-চেকার, বুম বাংলাদেশ। SynthID-এর হিটম্যাপ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংসদ সদস্যের সামনে রাখা ট্রেতে থাকা মদের বোতল, গ্লাস ও চানাচুরের অংশে Detected (নীল চিহ্নিত) চিহ্ন দেখা গেছে। অর্থাৎ ওই অংশে Google AI-এর ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া কিছু অংশ Unsure (ধূসর চিহ্নিত) হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে ওয়াটারমার্ক থাকার সম্ভাবনা থাকলেও টুলটি নিশ্চিত হতে পারেনি। অন্যদিকে Not detected (কমলা চিহ্নিত) অংশে কোনো ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক শনাক্ত হয়নি।

কোনো ছবির নির্দিষ্ট অংশে যদি SynthID-এর ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক শনাক্ত হয়, তাহলে সেটি Google AI-এর মাধ্যমে তৈরি বা সম্পাদিত হওয়ার শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ইঙ্গিত বহন করে। ফলে ছবিটি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে তৈরি বলে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে। তবে অনুসন্ধানে আলোচিত সম্পাদিত ছবিটির মূল বা অপরিবর্তিত সংস্করণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।