ফিটনেস ট্র্যাকার ও স্মার্টওয়াচ কবজিতে, স্মার্ট রিং আঙুলে, স্মার্ট ভেস্ট বুকে—স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণকারী পরিধানযোগ্য গ্যাজেটের জগতে এতদিন এটাই ছিল পরিচিত চিত্র। তবে ‘টেম্পল’ নামের একটি নতুন ডিভাইস প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ভিন্ন এক কারণে। এটি হাতে বা আঙুলে নয়, পরতে হয় কপালের পাশের টেম্পল অঞ্চলে।
টেম্পল ডিভাইসের উদ্দেশ্য ও কার্যপ্রণালী
ভারতের উদ্যোক্তা, ইন্টারনালের প্রতিষ্ঠাতা এবং জোম্যাটোর সাবেক প্রতিষ্ঠাতা দীপিন্দর গয়ালের প্রস্তাবিত এই ডিভাইসের লক্ষ্য প্রচলিত ওয়্যারেবল ডিভাইসগুলোর মতো শুধু হৃদস্পন্দন বা দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ নয়। বরং মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও বার্ধক্য প্রক্রিয়া সম্পর্কে রিয়েল-টাইম তথ্য দেওয়াই এর মূল উদ্দেশ্য।
দীপিন্দর গয়ালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান কন্টিনিউ রিসার্চের ‘গ্র্যাভিটি এজিং হাইপোথিসিস’ তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বা বসে কাটান। দীর্ঘসময় ধরে মহাকর্ষের প্রভাবে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ সামান্য কমে যেতে পারে, যা কয়েক দশক ধরে জমতে জমতে বার্ধক্য প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ ও বার্ধক্যের সম্পর্ক
এই তত্ত্বের কেন্দ্রে রয়েছে মস্তিষ্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ—হাইপোথ্যালামাস ও ব্রেইনস্টেম। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হরমোন নিঃসরণ, হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করে এই অংশগুলো। দীপিন্দরের দাবি, দীর্ঘমেয়াদে রক্তপ্রবাহের সামান্য ঘাটতিও এসব অঞ্চলের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে বার্ধক্য প্রক্রিয়ার ওপর।
গবেষণা তথ্য বলছে, মানুষের মস্তিষ্ক শরীরের মোট ওজনের মাত্র ২ শতাংশ হলেও এটি মোট শক্তির প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহার করে। একইসঙ্গে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এ কারণেই কন্টিনিউ রিসার্চ সেরিব্রাল ব্লাড ফ্লো (সিবিএফ) বা মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহকে দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করছে।
টেম্পল ডিভাইসের বৈশিষ্ট্য ও বিতর্ক
এই ধারণা থেকেই তৈরি হয়েছে ‘টেম্পল’। যেখানে স্মার্টওয়াচ বা ফিটনেস ট্র্যাকার মূলত হৃদস্পন্দন, ঘুম ও শারীরিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে, সেখানে টেম্পল সরাসরি মাথার টেম্পল অঞ্চল থেকে শারীরবৃত্তীয় সংকেত সংগ্রহ করে। পরে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীকে মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ সম্পর্কিত তথ্য দেয়।
ডিভাইসটিতে ‘এনট্রপি’ নামে একটি নতুন বায়োমার্কারও ব্যবহার করা হয়েছে। এটি শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় কতটুকু শক্তি ব্যয় হচ্ছে, তার একটি রিয়েল-টাইম সূচক হিসেবে কাজ করে। স্কোরটি ১ থেকে ২৫০-এর মধ্যে ওঠানামা করে এবং ব্যবহারকারীর শারীরবৃত্তীয় তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেয়।
তবে এই ডিভাইস ও সংশ্লিষ্ট তত্ত্ব নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। স্নায়ুবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের একাংশের মতে, মানুষের শরীরে এমন স্বয়ংক্রিয় জৈবিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা ভঙ্গি পরিবর্তন বা শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের পরও মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহকে মোটামুটি স্থিতিশীল রাখে। ফলে মহাকর্ষকে বার্ধক্যের প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আরও বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।
প্রাথমিক উৎপাদন ও পরীক্ষামূলক বিতরণ
প্রাথমিকভাবে মাত্র ১০০টি টেম্পল ডিভাইস তৈরি করা হয়েছে। তবে সেগুলো এখনই বাজারে ছাড়া হচ্ছে না। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে গবেষক, চিকিৎসক, ক্রীড়াবিদ এবং স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিদের হাতে ডিভাইসটি তুলে দেওয়া হবে।



