ডিজিটাল লেনদেনকে আরও বিস্তৃত করতে জাতীয় পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) প্ল্যাটফর্মে বাংলা কিউআর কোডের মাধ্যমে মার্চেন্ট পেমেন্টে ভ্যাটসহ সর্বনিম্ন ১ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে এ হার ছিল ১ দশমিক ১৫ শতাংশ, যার সঙ্গে ভ্যাট যুক্ত হতো। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের চার্জ কিছুটা কমেছে।
নতুন এমডিআর কাদের ওপর চাপবে?
অবশ্য নতুন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর অনেকের মনে প্রশ্ন উঠেছে—এই ফি কি গ্রাহকের কাছ থেকে কাটা হবে, নাকি দোকানদারের কাছ থেকে? বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, গ্রাহকের ওপর কোনও অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা হবে না। একজন ক্রেতা যে পরিমাণ অর্থের পণ্য বা সেবা কিনবেন, তার ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট থেকে ঠিক সেই পরিমাণ টাকাই কাটা হবে। নির্ধারিত এমডিআর বা সেবা ফি কেটে নেওয়া হবে মার্চেন্টের প্রাপ্য অর্থ থেকে।
অর্থাৎ, একজন ক্রেতা বাংলা কিউআর স্ক্যান করে ১ হাজার টাকার পণ্য কিনলে তার অ্যাকাউন্ট থেকে ১ হাজার টাকাই কাটা হবে। তবে দোকানদারের হিসাবে জমা হবে প্রায় ৯৯০ টাকা। বাকি প্রায় ১০ টাকা (ভ্যাটসহ ১ শতাংশ এমডিআর) অ্যাকোয়ারিং ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সেবা ফি হিসেবে পাবে।
প্রমোশনের সুযোগ ও আগের হারের তুলনা
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ডিজিটাল লেনদেন জনপ্রিয় করতে অ্যাকোয়ারিং ব্যাংক, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি) বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান চাইলে নিজস্ব প্রমোশনাল কর্মসূচির আওতায় এই ফি আংশিক বা সম্পূর্ণ নিজেরা বহন করতে পারবে। ফলে বিশেষ প্রচারণার সময়ে মার্চেন্টদেরও এ চার্জ দিতে নাও হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ সার্কুলারে বাংলা কিউআরভিত্তিক মার্চেন্ট পেমেন্টে এমডিআরের সর্বনিম্ন হার ভ্যাটসহ ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এ হার ছিল ১ দশমিক ১৫ শতাংশ, যার সঙ্গে ভ্যাট যুক্ত হতো। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীদের চার্জ কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরও উৎসাহিত করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) লেনদেন ব্যয় কমানোর লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
রাজধানীর মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকানে বাংলা কিউআর কোড ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। চা-স্টল থেকে শুরু করে পোশাকের দোকান—সবখানেই স্মার্টফোন স্ক্যান করে নগদবিহীন লেনদেন করছেন ক্রেতারা। তবে মার্চেন্টদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রতিটি বিক্রির ওপর ১ শতাংশ চার্জ কেটে নেওয়ায় তাদের লাভের মার্জিন কমে যাবে। বিশেষ করে কম মুনাফার পণ্যের ক্ষেত্রে এই ব্যয় তাদের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। অপরদিকে অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, নগদ অর্থ বা ভাঙতি টাকার ঝামেলা কমে যাওয়ায় গ্রাহকসেবা সহজ হবে এবং বিক্রিও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক যা বলছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, 'একজন ক্রেতা ১০০ টাকার পণ্য কিনলে তাকে অতিরিক্ত কোনো অর্থ দিতে হবে না। তিনি ১০০ টাকাই পরিশোধ করবেন। তবে মার্চেন্ট ১০০ টাকার পরিবর্তে ৯৯ টাকা পাবেন।' একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরেকটি সার্কুলারে অ্যাকোয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনে প্রণোদনা বা অন্যান্য সুবিধা দিয়ে মার্চেন্টদের উৎসাহিত করার সুযোগও দিয়েছে।
যেভাবে পাওয়া যাবে বাংলা কিউআর
বাংলা কিউআর ব্যবহারের জন্য একজন ব্যবসায়ীকে প্রথমে কোনো ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা অনুমোদিত পেমেন্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। এরপর নির্ধারিত আবেদনপত্র জমা দিলে সাধারণত তিন থেকে চার কার্যদিবসের মধ্যে বাংলা কিউআর কোড সরবরাহ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, নগদবিহীন লেনদেন সহজ করার পাশাপাশি নিরাপদ ও স্বচ্ছ পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলা কিউআরের ব্যবহার আগামী দিনে আরও বাড়বে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বিবেচনায় প্রণোদনা ও সহায়ক উদ্যোগ বাড়ানো গেলে এ উদ্যোগ আরও দ্রুত জনপ্রিয় হবে।



