দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে হাম। এই সংকটের বিস্তার ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। হাম নিয়ে নানা অপতথ্যে সয়লাব এখন ফেসবুক। দেশের পাশাপাশি বিদেশের ঘটনাবলি নিয়েও অপতথ্যের কমতি নেই। ভারতের তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী থালাপতি বিজয় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, এমন গুজবও ছড়িয়েছে।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন
দেশের পাঁচটি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ৯ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত মোট ১৫০টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্ল্যাটফর্ম হিসেবে অপতথ্য সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ফেসবুকে, ৯১ শতাংশ। এ ছাড়া ইনস্টাগ্রাম, টিকটক ও ইউটিউবেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর প্রমাণ মিলেছে।
জাতীয়ভাবে আলোচিত হাম সংকট ঘিরে অন্তত ১৩টি অপতথ্য শনাক্ত হয়, যার বড় অংশই ছিল ভুয়া মন্তব্য ও বিভ্রান্তিকর দাবি।
ইনকিলাব মঞ্চের সংবাদ সম্মেলন
এর মধ্যে আলোচিত একটি দাবি আসে ১৩ মে হাম নিয়ে আয়োজিত ইনকিলাব মঞ্চের সংবাদ সম্মেলন থেকে। সেখানে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের বলেন, ‘দেশে সব থেকে ভয়াবহ ব্যাপার যেটা, সেটা হচ্ছে আমাদের মায়েরা তাঁদের ফিটনেস ধরে রাখবার জন্য, তাঁরা সন্তানদেরকে বুকের দুধ পান করান না, একটা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যে ৫৫% মা তার…এই যে পাশ্চাত্য যে সংস্কৃতি…এই যে অপসংস্কৃতি, যে তাঁর সন্তানকে দুধ খাওয়ালে তাঁর ফিটনেস নষ্ট হয়ে যাবে, এই কারণে ৫৫% মা তাঁর সন্তানকে দুধ খাওয়ান না।’
রিউমর স্ক্যানার দাবিটি যাচাই করে দেখে যে তিনি এ তথ্যের সূত্র হিসেবে ডয়চে ভেলের একটি প্রতিবেদনের কথা বলেন। কিন্তু ওই প্রতিবেদনে ফিটনেসের কারণে মায়েরা বুকের দুধ খাওয়ান না—এমন কোনো তথ্য নেই। প্রতিবেদনে শুধু মাতৃদুগ্ধ পানের হার কমে যাওয়া ও শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিষয়টি এসেছে এক চিকিৎসকের বয়ানে।
এই এক সপ্তাহে রিউমর স্ক্যানার ১১১টি, ফ্যাক্টওয়াচ ১৫টি, বাংলা ফ্যাক্ট ১৩টি, দ্য ডিসেন্ট ৭টি এবং ডিসমিসল্যাব ৪টি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনগুলোর মধ্যে ৭৬টি রাজনীতিকেন্দ্রিক।
রাজনৈতিক অপতথ্যের প্রভাব
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে ঘিরে অন্তত ৭৬টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এর বড় অংশজুড়েই ছিল ভুয়া মন্তব্য, পুরোনো ভিডিওকে নতুন দাবি দিয়ে প্রচার এবং স্যাটায়ার পোস্টকে বাস্তব তথ্য হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা।
বিএনপি নেতার নামে ভুয়া মন্তব্য
এর মধ্যে আলোচিত ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে দুই বাংলাদেশি নিহত হওয়ার পর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর ছবি ব্যবহার করে তাঁর নামে একটি বিতর্কিত মন্তব্য ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন—ভারতের সীমান্তে ‘চোরাকারবারি’ ও ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ করলেও সমস্যা নেই, সমস্যা হয় কেবল গুলি করে মারলে। পরে যাচাইয়ে জানা যায়, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। মূলত ‘Bengali Steam’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা অনেকে বিশ্বাসও করছেন।
শেহরীন আমিন ভূঁইয়ার নামে ভুয়া মন্তব্য
একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরীন আমিন ভূঁইয়ার (মোনামী) নামে ‘জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক নেই’ শীর্ষক একটি ভুয়া মন্তব্য প্রচার করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘গুপ্ত টেলিভিশন’ নামের একটি সার্কাজম পেজ থেকেই দাবিটির সূত্রপাত, যা পরে ছড়িয়ে পড়ে।
সারজিস আলমের নামে ভুয়া মন্তব্য
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের নামেও ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হয়। সেখানে দাবি করা হয়, জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়াকে তিনি ‘ভুল’ বলেছেন। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে সম্পাদিত একটি ভুয়া ফটোকার্ড ব্যবহার করে এ দাবি প্রচার করা হয়েছে।
পুরোনো ভিডিওর অপব্যবহার
রাজনৈতিক অপতথ্যে শুধু ভুয়া মন্তব্যই নয়, পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিওও নতুন দাবি দিয়ে ছড়ানো হয়েছে। ‘আওয়ামী লীগ মাঠে নেমে গেছে’ শিরোনামে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওকে সাম্প্রতিক ঘটনা দাবি করা হলেও সেটি ছিল ২০২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ভিডিও।
অন্যদিকে রাজধানীতে এক ছাত্রলীগ নেত্রীকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ‘মব’ করে তুলে নিয়ে গেছে—এমন দাবিতে ছড়ানো আরেকটি ভিডিওও ছিল বিভ্রান্তিকর। ভিডিওটিতে এক নারী শ্লীলতাহানির দৃশ্য দেখা গেলেও, যাচাইয়ে জানা যায় এটি বাংলাদেশের নয়; বরং ভারতে সংঘটিত যৌন হয়রানির একটি ঘটনার ভিডিও।
আন্তর্জাতিক অপতথ্য
গত এক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বিষয় ধরে অন্তত ৩৪টি ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এর বড় অংশজুড়ে ছিল ভারতীয় রাজনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন আলোচিত ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ভুয়া মন্তব্য, প্রেক্ষাপটহীন ভিডিও ও পুরোনো ছবি।
থালাপতি বিজয়ের নামে ভুয়া মন্তব্য
এর মধ্যে ভারতের তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের নামে একটি মন্তব্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন—‘বাংলাদেশিরা ভিসা ছাড়াই ভারতে আসতে পারবেন।’ তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। মূলত ‘জানিনা টেলিভিশন’ নামের একটি সার্কাসমধর্মী ফেসবুক পেজের পোস্ট থেকেই দাবিটির সূত্রপাত।
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতা নিয়েও নানা বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়ানো হয়। ভাইরাল একাধিক পোস্টে দাবি করা হয়, নির্বাচনের পর সহিংসতায় ‘চার শতাধিক মুসলিমকে হত্যা’ করা হয়েছে। তবে রিউমর স্ক্যানারের যাচাই অনুযায়ী, ৪ মে থেকে ১৩ মে পর্যন্ত সহিংসতায় অন্তত ১৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে একজন মুসলমান।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন–পরবর্তী পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে, যেগুলোর সঙ্গে সহিংসতা, হামলা বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার দাবি জুড়ে দেওয়া হয়। তবে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসবের বড় অংশই ছিল পুরোনো ভিডিও, ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ঘটনা কিংবা ভারতের অন্য রাজ্যর দৃশ্য এমনকি বাংলাদেশের ভিডিও–ও ছিল এর মধ্যে।
নেপালের ভুয়া আইন
নেপালকে নিয়েও একটি ভুয়া দাবি ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুকে। দাবি করা হয়, দেশটিতে নতুন আইন পাস হয়েছে এবং ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। প্রকৃতপক্ষে এমন কোনো আইন নেপালে পাস হয়নি। নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র ছাড়াই দাবিটি ছড়ানো হচ্ছে এবং দেশটির বর্তমান সংবিধানেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান নেই।
জাতীয় অপতথ্য
বাংলাদেশকে ঘিরে ছড়ানো ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়েও গত সপ্তাহে ২০টির বেশি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এসব অপতথ্যের মধ্যে ছিল ভুয়া ফটোকার্ড, সাজানো ভিডিও ও আলোচিত বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে বানানো মন্তব্য।
ট্রাম্পের ভুয়া পোস্ট
এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে ‘বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫২তম অঙ্গরাজ্য হিসেবে “ট্রুথ সোশ্যালে” ট্রাম্পের পোস্ট’ শীর্ষক একটি ফটোকার্ড। ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে দৈনিক যুগান্তরের নকশার আদলে। তবে এ ধরনের কোনো সংবাদ বা ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি যুগান্তর।
সাজানো ধর্ষণচেষ্টার ভিডিও
এক নারীকে ধর্ষণচেষ্টার দৃশ্য দাবিতে ছড়ানো একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। যাচাইয়ে জানা যায়, এটি বাস্তব কোনো ঘটনার ভিডিও নয়, ভারতীয় একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের তৈরি সাজানো ভিডিও।
তারেক রহমানের ভুয়া মন্তব্য
হাম ও টিকা সংকটকে কেন্দ্র করে গত সপ্তাহে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও আলোচিত ব্যক্তিদের নামে একাধিক ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হয়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নামে ছড়ানো একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, তিনি দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে বলেছেন—‘আপনি টিকা চাচ্ছেন, তেল চাচ্ছেন, আবার এট দ্যা সেইম টাইম বিদ্যুৎ চাচ্ছেন। কোনো গভর্নমেন্টের পক্ষেই এটা দেওয়া সম্ভব না।’ তবে তারেক রহমান এমন কোনো মন্তব্য করেননি। মূলত ‘গুপ্ত টেলিভিশন’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্টকে এভাবে প্রচার করা হয়েছে।
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, হামের টিকা সংকট ঘিরে প্রকাশিত অধিকাংশ অপতথ্যই ছিল রাজনৈতিক ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে ছড়ানো ভুয়া মন্তব্য।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপতথ্য
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর শনাক্ত করা অন্তত ২০টি অপতথ্য ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ছবি, ভিডিও বা ফটোকার্ডকেন্দ্রিক। বাস্তব ঘটনার মতো দেখানো এসব কনটেন্ট অনেক ব্যবহারকারী সত্য মনে করে শেয়ার, মন্তব্য ও প্রচার করেছেন।
সেনাবাহিনীর এআই ছবি
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর গাবতলীর গরুর হাটে সেনাবাহিনী পাহারা দিচ্ছে—এমন দাবিতে একটি ছবিও ভাইরাল হয়। ছবিতে কয়েকজন সেনাসদস্যকে গরুর হাটে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেলেও যাচাইয়ে জানা যায়, এটি তৈরি করা হয়েছে এআই দিয়ে।
পচা আমের এআই ছবি
আমজনতার দলের সদস্যসচিব তারেক রহমান এবং নারী অ্যাগ্রো–ইনফ্লুয়েন্সার উম্মে কুলসুম পপির কাছ থেকে কিনে ‘পচা আম’ পাওয়ার ছবিগুলোও এআই দিয়ে তৈরি।
স্যাটায়ার ও ভুয়া মন্তব্যের প্রবণতা
তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণে আরও দেখা যায়, ভুয়া ফটোকার্ডে বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রবণতা কিছুটা কমলেও নতুনভাবে ভুয়া মন্তব্য ও স্যাটায়ার কনটেন্টকে সত্য হিসেবে প্রচারের ঘটনা বেড়েছে। গত সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমের ভুয়া ফটোকার্ড নিয়েই ৯টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে স্যাটায়ার পেজ থেকে ছড়ানো বিভ্রান্তি নিয়ে ২১টি এবং ভুয়া মন্তব্যসংক্রান্ত ৩৩টির বেশি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
আবার সমসাময়িক আলোচিত বিষয় নিয়ে ভুয়া মন্তব্য সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। যেমন হামের টিকা সংকট সংক্রান্ত ১৩টি ফ্যাক্ট চেকের মধ্যে ১২টিই ছিল বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের নামে বানানো ভুয়া মন্তব্য নিয়ে।



