ছয় বছর ধরে পাবনা সুগার মিলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই চিনিকলটি দীর্ঘদিন অচল থাকায় প্রায় ৮০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ও মালামাল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং ঋণের সুদ মিলিয়ে বাড়ছে আর্থিক বোঝা। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় আখচাষিরা।
বর্তমান কর্মী ও ব্যয়
চিনিকল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মিলটিতে ২২ জন স্থায়ী ও ৩০ জন অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তাদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। ২০২০ সালে উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর গত ছয় বছরে শুধু বেতন-ভাতার পেছনেই সরকারের ব্যয় হয়েছে ৮ কোটিরও বেশি টাকা।
পুনরায় চালুর উদ্যোগ
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চিনিকলটির উৎপাদন বন্ধের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে দ্বিতীয় ধাপে মিল চালুর ঘোষণা দেয়। তবে ঘোষণার প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও মিল পুনরায় চালুর বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। এদিকে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সপ্তম দিনে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বন্ধ চিনিকলগুলো পুনরায় চালুর পরিকল্পনার কথা জানান। তবে সংশ্লিষ্ট মিল কর্তৃপক্ষের দাবি, এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা বা বার্তা তারা পাননি।
মিলের ইতিহাস ও ঋণের বোঝা
জানা যায়, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দাশুড়িয়া এলাকায় ৬০ একর জমির ওপর প্রায় ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় পাবনা সুগার মিল। ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ সালে পরীক্ষামূলক উৎপাদনের পর ১৯৯৯ সালে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করে মিলটি। পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করা হয়। সুদে-আসলে সেই ঋণের পরিমাণ বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৫৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। একদিকে বিপুল ঋণের বোঝা, অন্যদিকে ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর মিলটির মাড়াই ও উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত করে সরকার।
উৎপাদন ও ক্ষতি
মিলের হিসাবরক্ষণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদন বন্ধ হওয়ার বছরেও মিলটি প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টন চিনি উৎপাদন করেছিল। বর্তমানে মিলের কাঁধে ৫৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার ঋণের পাশাপাশি প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা সুদ যোগ হচ্ছে। একসময় এ মিলে প্রায় ১ হাজার ২০০ শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকায় বিপুল মূল্যের যন্ত্রপাতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একসময় শ্রমিক ও আখচাষিদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকা মিল এলাকা এখন অনেকটাই জনশূন্য ও নিস্তব্ধ।
স্থানীয় বাসিন্দার প্রতিক্রিয়া
মিল এলাকার বাসিন্দা মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, 'চিনিকলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুরো এলাকায় এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মিলটি দ্রুত চালু হলে আখচাষি, কৃষক ও স্থানীয় অর্থনীতি সবাই উপকৃত হবে।'
আখচাষি কল্যাণ সমিতির দাবি
পাবনা সুগার মিল আখচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি এবং স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত জাতীয় কৃষক শাহজাহান আলী বাদশা বলেন, 'পাবনা চিনিকলের উৎপাদন সক্ষমতা ও চিনির মান দেশের অনেক চিনিকলের তুলনায় ভালো ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও আমরা মিল চালুর আবেদন জানিয়েছিলাম। আশ্বাস পেলেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে দ্রুত মিলটি চালুর দাবি জানাচ্ছি।'
ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতামত
পাবনা সুগার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আখতারুজ্জামান বলেন, 'মিলটি পুনরায় চালু করতে হলে আধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি শুধু চিনি নয়, স্পিরিট, জৈবসার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো বহুমুখী কার্যক্রম চালু করা গেলে মিলটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব।'



