নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুরে দীর্ঘ লোডশেডিং: শিল্প উৎপাদন ও জনজীবন বিপর্যস্ত
নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুরে লোডশেডিংয়ে শিল্প-জীবন বিপর্যস্ত

নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুরে বিদ্যুৎ সংকট: শিল্প ও কৃষিতে ধস

নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে বিদ্যুতের তীব্র সংকটে প্রতিদিন পাঁচ থেকে আট ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে, যা স্থানীয় শিল্পকারখানার উৎপাদনকে ব্যাপকভাবে ব্যাহত করছে। এই অবস্থায় কলকারখানাগুলো তাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারছে না, ফলে তারা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। পাশাপাশি, বোরো মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচ কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ায় কৃষকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।

নারায়ণগঞ্জে শিল্প উৎপাদনে ধ্বস

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কেওঢালা এলাকার টোটাল ফ্যাশন লিমিটেড নামক একটি ডাইং কারখানায় গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়েছে। কারখানাটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা কবিরুল ইসলাম জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের দৈনিক উৎপাদন ১০ টন থেকে কমে মাত্র দুই টনে নেমে এসেছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, লোডশেডিং মোকাবিলায় চাহিদামতো ডিজেলও পাওয়া যাচ্ছে না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ও সমিতি-২ এর তথ্যমতে, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ যথাক্রমে ৩০-৪০ শতাংশ ও ৩০ শতাংশ কম থাকায় ঘাটতি পূরণে লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। বন্দরের মালিবাগ এলাকার বাশার পেপারস লিমিটেড কারখানায় প্রতিদিন ১৫ টন কার্টনের কাগজ তৈরি করার লক্ষ্য থাকলেও লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন কমে ৮-৯ টনে নেমে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা বলেন, প্রতিদিন ৫-৬ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, যা উৎপাদনকে অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গাজীপুরে জনজীবন অতিষ্ঠ

গাজীপুরের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতাধীন এলাকাগুলোতে দিনে-রাতে ৭-৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। কুনিয়া গাছা সড়কের আম্মাজান হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট এর মালিক আজিজুল হক জানান, প্রতিদিন ভোরে হোটেল খোলা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত অন্তত ছয় থেকে সাতবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে, যা ব্যবসায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। লক্ষ্মীপুরা এলাকার গৃহিণী সখিনা বেগমের মতে, বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, বিশেষ করে পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধার সৃষ্টি করছে।

গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক মো. আবুল বাশার আজাদ স্বীকার করেছেন যে, চাহিদা ৪৮৪ মেগাওয়াটের বিপরীতে মাত্র ৩১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, কেন্দ্রীয়ভাবে তাঁদের বলা হয়েছে, গ্রাহকদের একটু বোঝাতে, খুব তাড়াতাড়ি বিদ্যুতের অবস্থার উন্নতি হবে

কৃষি ও স্বাস্থ্যখাতে প্রভাব

লোডশেডিংয়ের প্রভাব শুধু শিল্পেই সীমাবদ্ধ নেই; কৃষি ও স্বাস্থ্যখাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কাপাসিয়ার ঘাগটিয়া ইউনিয়নের কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় ঠিকমতো সেচ দেওয়া যাচ্ছে না, যা ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মু. সালাহউদ্দিন আইউবী জাতীয় সংসদে উল্লেখ করেছেন, কাপাসিয়ায় ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, হাসপাতালের রোগীদের সেবা ও সেচব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

এদিকে, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি) নারায়ণগঞ্জের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কামাল হোসেন দাবি করেন, তাদের আওতাধীন এলাকায় লোডশেডিং নেই, তবে রক্ষণাবেক্ষণ বা কারিগরি সমস্যার কারণে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে। কিন্তু স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে শিল্প ও অর্থনীতিতে মারাত্মক ক্ষতি করছে।

সর্বোপরি, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে বিদ্যুতের এই সংকট দ্রুত সমাধান না হলে শিল্প উৎপাদন, কৃষি কার্যক্রম ও জনজীবন আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।