জ্বালানি সংকটে তৈরি পোশাক শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ২৫-৩০ শতাংশ কমেছে
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। চাহিদামতো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গাজীপুর ও আশুলিয়ায় উৎপাদন ও শিপমেন্ট ব্যাহত
বিশেষ করে গাজীপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের অবস্থা আরও ভয়াবহ। লোডশেডিংয়ের বিপরীতে জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং পণ্য শিপমেন্ট মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে গতকাল সোমবার এক সাক্ষাতে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এই তথ্য উপস্থাপন করেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সেলিম রহমান এবং সহসভাপতি মিজানুর রহমান প্রমুখ। বিজিএমইএর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জ
বিজিএমইএর সভাপতি আরও বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ক্রেতাদের আস্থা কিছুটা ফিরে এলেও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজার আবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলো জ্বালানি নিরাপত্তায় এগিয়ে থাকার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বাড়তি খরচ শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
সংকট মোকাবিলায় বিজিএমইএর প্রস্তাবনা
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় বিজিএমইএর সভাপতি বেশ কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থায় ফিলিং স্টেশন থেকে দ্রুত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য জরুরি গ্যাস-সংযোগ প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এছাড়াও শিল্পকারখানায় ইভিসি মিটার স্থাপন এবং আমদানি করা জ্বালানির ওপর আমদানি ও ভোক্তা পর্যায়ে সব কর ও ভ্যাট প্রত্যাহার করে উৎপাদন খরচ কমানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। বিজিএমইএর নেতারা পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে তৈরি পোশাক শিল্পে সোলার পিভি সিস্টেমের সরঞ্জামাদি আমদানিতে বিশেষ শুল্ক রেয়াতি সুবিধার দাবি জানান।
সোলার প্যানেল ও যন্ত্রপাতির শুল্ক কমানোর প্রস্তাব
বিজিএমইএর পক্ষ থেকে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ডিসি কেবল এবং বিইএসএসের মতো অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতির ওপর বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক (২৮.৭৩ শতাংশ থেকে ৬১.৮০ শতাংশ) কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপ শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের আশ্বাস ও ডিজেল সরবরাহের অনুমোদন
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বিজিএমইএ প্রতিনিধিদলের প্রস্তাবনাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে শুনেছেন। দেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা বিবেচনা করে সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে নিকটবর্তী ফিলিং স্টেশন থেকে ডিজেল সরবরাহ করার জন্য বিজিএমইএর প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্র অনুমোদন করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। এই সিদ্ধান্ত শিল্পের চলমান সংকট কিছুটা লাঘব করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।



