ওয়াল স্ট্রিটের রেকর্ড: যুদ্ধের মাঝেও মুনাফার জোয়ার
ওয়াল স্ট্রিটের রেকর্ড: যুদ্ধের মাঝেও মুনাফার জোয়ার

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চলমান, তেলের চড়া দাম, মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, এমন পরিস্থিতিতে ওয়াল স্ট্রিটের রেকর্ড গড়া অনেকের কাছেই কিছুটা অযৌক্তিক মনে হতে পারে। তবে বিনিয়োগকারীদের কাছে সব হিসাব শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় এসে দাঁড়ায়, আর তা হলো, প্রতিষ্ঠানগুলো কেমন মুনাফা করছে? আর এই মুহূর্তে কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী মুনাফাই ওয়াল স্ট্রিটকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।

যুদ্ধের শুরুতে ভীতি, পরে পুনরুদ্ধার

গত মাসে যুদ্ধের শুরুর দিকে ভীতি থেকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক তার আগের রেকর্ড থেকে প্রায় ১০ শতাংশ পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ধৈর্যশীল বিনিয়োগকারীরা সবসময়ই এর সুফল পেয়েছেন। সূচকটি তার সব ক্ষতি পুষিয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বুধবার এই সূচকটি ৭,১৩৭.৯০ পয়েন্টের রেকর্ড উচ্চতায় গিয়ে লেনদেন শেষ করেছে।

বাজারের চালিকা শক্তি: মুনাফা ও আগ্রহ

শেয়ার বাজারের দর সাধারণত দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, কোম্পানির মুনাফা এবং প্রতিটি ডলারের বিপরীতে বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগ করার আগ্রহ। যুদ্ধের শুরুর দিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক ভীতি কাজ করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে বেড়ে যাবে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঢেউ আছড়ে পড়বে। সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিস্থিতির পরিবর্তন ও তেলের দাম

তবে মার্চ মাসের শেষ দিক থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে চায় বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। যুদ্ধ শেষ হওয়া উভয় দেশেরই অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে যদিও যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি বেশ নাজুক, তবুও বাজারের আতঙ্ক কিছুটা কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম যুদ্ধের আগে প্রায় ৭০ ডলার ছিল, যা উদ্বেগের সময় বেড়ে ১১৯ ডলারে পৌঁছায়। এখন তা ১০০ ডলারের কাছাকাছি ওঠানামা করছে।

অর্থনৈতিক যুদ্ধের কৌশল

ম্যাককুয়েরি গ্রুপের কৌশলবিদ থিয়েরি ওয়িজম্যানের মতে, ইরানকে তেল থেকে আয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক যুদ্ধ হয়তো সরাসরি সামরিক যুদ্ধের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। বিনিয়োগকারীরাও সম্ভবত এমনটাই ভাবছেন যে, এই অর্থনৈতিক চাপ যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত না করে দ্রুত শেষ করতে সহায়তা করবে।

কোম্পানির মুনাফায় মনোযোগ

বাজারের আতঙ্ক কমার পর বিনিয়োগকারীদের মনোযোগ এখন কোম্পানির মুনাফার দিকে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের তালিকাভুক্ত ১৫ শতাংশেরও বেশি কোম্পানি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসের মুনাফার হিসাব প্রকাশ করেছে এবং তাদের বেশিরভাগই বিশ্লেষকদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। ফ্যাক্টসেটের তথ্যমতে, বাকি কোম্পানিগুলো যদি বিশ্লেষকদের প্রাক্কলনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, তবে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক আয় গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি হতে পারে।

প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের ইতিবাচক মতামত

ব্যাংক অব আমেরিকার প্রধান নির্বাহী ব্রায়ান ময়নিহান বলেন, ‘আমরা গ্রাহকদের স্বতঃস্ফূর্ত কার্যক্রম দেখেছি, যার মধ্যে ভোক্তা ব্যয় এবং সম্পদের স্থিতিশীলতা স্পষ্ট। এটি প্রমাণ করে যে আমেরিকান অর্থনীতি বেশ শক্তিশালী।’

একই সুর শোনা গেছে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কণ্ঠে। ডেল্টা এয়ারলাইনস জানিয়েছে, ব্যবসায়িক ও অবকাশকালীন উভয় ক্ষেত্রেই তাদের যাত্রীদের চাহিদা বেড়েছে। পেপসিকোর প্রধান নির্বাহী রামোন লাগুয়ার্তা জানিয়েছেন, তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসা বেশ স্থিতিস্থাপক। জিই ভার্নোভা জানিয়েছে, এআই ডেটা সেন্টারের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা আকাশচুম্বী হওয়ায় তারা বছরের আয়ের পূর্বাভাস বাড়িয়েছে।

ঝুঁকি এখনও বিদ্যমান

অবশ্য ওয়াল স্ট্রিটের এই অগ্রযাত্রা যে কোনও সময় থমকে যেতে পারে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান আলোচনা ভেস্তে গেলে এবং বিশ্ববাজারে তেলের সংকট দেখা দিলে বাজারের মনমেজাজ দ্রুত বদলে যেতে পারে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে তা কোম্পানিগুলোর মুনাফাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে তা ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে। ওয়াল স্ট্রিট শক্তিশালী মনে হলেও, যুদ্ধের অনিশ্চয়তা এখনও বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে রয়ে গেছে।