পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় বিএনপিপন্থীদের হাতে আসায় এই খাতে কোনো বদল এসেছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির পরিবহনবিষয়ক সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, তেমন পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান করা যায়নি। তবে গবেষণা করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, পরিবহন খাতের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা, রাস্তাঘাট ও সরকার জড়িত। সরকারের মধ্যে প্রশাসন ও পুলিশ রয়েছে। এর বাইরে পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা আছেন। সবার মধ্যে শৃঙ্খলা ও নিয়ম থাকা দরকার, যা গত ১৫ বছরে ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
চালকদের বেতনভুক্ত করার উদ্যোগ
সাইফুল আলম একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, নিয়ম হলো বাসের মালিক লাভ–লোকসানের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসা করবেন এবং চালকেরা নিয়মিত বেতন পাবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মালিক চালকের কাছে গাড়ি চুক্তি দিয়ে দেন। চালক দিন শেষে মালিককে নির্দিষ্ট টাকা দেন এবং নিজের আয় বাড়াতে গিয়ে কোনো আইন মানেন না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চালকদের নিয়মিত বেতনের আওতায় আনতে হবে এবং তাদের সুশৃঙ্খলভাবে বাস চালানো নিশ্চিত করতে হবে।
বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রস্তাব
পরিবর্তনের চেষ্টা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাইফুল আলম বলেন, সড়ক মন্ত্রণালয়কে করণীয় সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ ও মালিক-শ্রমিক নেতাদের নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। তিনি বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজির ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন। বর্তমানে ঢাকার প্রতিটি রুটে তিন থেকে পাঁচটি কোম্পানির বাস পাল্লাপাল্লি করে চলে। একটি কোম্পানির অধীনে এনে সিরিয়াল করে চলাচল করানো সম্ভব। গাড়িতে অটো ডোর থাকতে হবে এবং সব বাসের রং এক হতে হবে। ফিটনেস হালনাগাদ ও যাত্রীদের আসন সঠিকভাবে আছে কিনা, সব দেখা যাবে।
মেয়াদোত্তীর্ণ বাসের দায় কার?
ঢাকায় মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন বাস চলাচলের দায় কার—এমন প্রশ্নে সাইফুল আলম বলেন, সরকার ২০ বছরের বেশি বয়সী বাস এবং ২৫ বছরের বেশি বয়সী ট্রাক চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। তবে তিনি মত দেন, বয়সের চেয়ে ফিটনেস দেখা উচিত। অনেক সময় পাঁচ বছরের পুরোনো বাসও দেখতে মেয়াদোত্তীর্ণ মনে হয়, কারণ শৃঙ্খলার অভাবে পাল্লাপাল্লি করতে গিয়ে বাসের বাহ্যিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মনে হয় সেটি মেয়াদোত্তীর্ণ।
অতিরিক্ত আসন ও বাড়তি ভাড়া
বাসে নির্ধারিত আসনের চেয়ে বেশি আসন বসিয়ে যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট এবং সিটিং সার্ভিসের নামে বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে সাইফুল আলম বলেন, এটি অব্যবস্থাপনার ফল। মালিক চুক্তিতে বাস চালকের কাছে দিয়ে দেন, কিন্তু নিজে দেখাশোনা করেন না। তিনি সঠিক সংখ্যার আসন রাখার ওপর জোর দেন। আইনে নগরে ১০ থেকে ১৫ জন দাঁড় করিয়ে নেওয়ার অনুমতি আছে। আরটিসির মাধ্যমে নতুন রুট পারমিট দেওয়ার সময় আসনসংখ্যা ও আসনের রেক্সিন ঠিক আছে কিনা দেখা হচ্ছে, যাতে পরে পুলিশ অভিযানে যেতে পারে।
কালো ধোঁয়া ও পরিবেশদূষণ
ঢাকার ৮৪ শতাংশ বাস কালো ধোঁয়া ছাড়ে—এমন গবেষণার প্রসঙ্গে সাইফুল আলম বলেন, সরকার অভিযানে গিয়ে দেখেছে পরিত্যক্ত মবিল কেমিক্যাল দিয়ে কোটায় ভরে বাজারজাত করা হচ্ছে। বাসমালিকেরা সেগুলো কিনছেন, যা কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে এবং ইঞ্জিন নষ্ট করছে। জ্বালানির মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। অনেক সময় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ও নিম্নমানের খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে কালো ধোঁয়া হয়। পুরোনো যানবাহনও এর কারণ।
চাঁদাবাজি বন্ধের উপায়
বাস থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ সম্পর্কে সাইফুল আলম বলেন, কোম্পানি চালাতে কিছু ন্যায্য খরচ আছে, যা মালিকদেরই বহন করতে হয়। কিন্তু একাধিক ব্যক্তির বাস কোম্পানির নামে চললে কোম্পানির উদ্যোক্তারা দৈনিক আয় থেকে জিপি বা গেটপাস কেটে নেন। তিনি দাবি করেন, তিনি ইচ্ছেমতো জিপি নেওয়া বন্ধ করতে বলেছেন এবং লিখিত চুক্তি ও নিরীক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা পর্যায়ে টার্মিনালের টোলের নামে চাঁদাবাজি হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা টার্মিনাল ইজারা নিয়ে চাঁদা নির্ধারণ করে দ্বিগুণ নেয়। অথচ টার্মিনালে বাস রাখার জায়গা, টয়লেট বা অন্য সুবিধা নেই। সারা দেশে ব্যক্তি, এলাকার প্রভাবশালী ও অবৈধ শ্রমিক কমিটির নামে চাঁদা তোলা হয়। এগুলোর ব্যাপারে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বাস ছাড়ার স্থান থেকে সমিতির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা নেওয়া যাবে, মাঝপথে নয়।
সরকারের কাছে প্রত্যাশা
নতুন সরকারের কাছে পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে নির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা জানতে চাইলে সাইফুল আলম বলেন, বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে অনুরোধ জানানো হবে। সরকার মেট্রোরেলে ভর্তুকি দিচ্ছে, যা আরামদায়ক ও সুশৃঙ্খল। বাস খাতে ভর্তুকি না দিলেও নীতিসহায়তা দেওয়া যেতে পারে। নতুন বাস আমদানির শুল্ক কমানো এবং ইলেকট্রিক গাড়ি আনার কথাও বলেন তিনি।
সরকারি সহায়তার প্রয়োজনীয়তা
প্রশ্ন করা হয়, বিএনপি কখনো সেবা দিতে পারেনি, তাহলে সরকার কেন নীতিসহায়তা দেবে? জবাবে সাইফুল আলম বলেন, সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসিকে শত শত কোটি টাকার বাস কিনে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তারা সেবা দিতে পারেনি বা লাভজনক হয়নি। বেসরকারি খাতের মালিকেরা সরকারি সহায়তা ছাড়াই যতটুকু সম্ভব সেবা দিচ্ছেন। সরকারি সহায়তা পেলে এই খাতের চেহারা পাল্টে যাবে বলে তিনি আশাবাদী।



