বেপজার ৪৫ বছরের যাত্রা: রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে অভূতপূর্ব সাফল্য
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। ১৯৮০ সালে রপ্তানিমুখী শিল্প এলাকা প্রতিষ্ঠার প্রথম উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে দেশের শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা। আজ বুধবার বেপজার ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে, যা এই সংস্থার অর্জন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার দিকে আলোকপাত করে।
শুরুর পথচলা ও প্রাথমিক সাফল্য
বেপজা প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮১ সালের ১৫ এপ্রিল। যুদ্ধ–পরবর্তী বাংলাদেশে তখন বিদেশি বিনিয়োগ ও রপ্তানি আয় ছিল অত্যন্ত সীমিত, এবং কৃষিই ছিল প্রধান অর্থনৈতিক খাত। ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রামে দেশের প্রথম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের মাধ্যমে বেপজা তার কার্যক্রম শুরু করে। মাত্র ৮–১০ বছরের মধ্যেই চট্টগ্রাম ইপিজেডের সফলতা সরকারকে অন্যান্য অঞ্চলেও ইপিজেড প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করে।
পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে ঢাকা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সাভার-আশুলিয়া এলাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরিত হয়। ধীরে ধীরে মোংলা, কুমিল্লা, নীলফামারী (উত্তরা) এবং পাবনা (ঈশ্বরদী) সহ বিভিন্ন অঞ্চলে ইপিজেড স্থাপনের মাধ্যমে শিল্পায়নের বিস্তার ঘটে। এছাড়াও, বন্ধ কারখানাগুলোকে ইপিজেডে রূপান্তরের মাধ্যমে পুরনো শিল্প স্থাপনাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়, যেমন নারায়ণগঞ্জের আদমজী জুট মিল এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী স্টিল মিলস।
অর্থনৈতিক অবদান ও পণ্য বৈচিত্র্য
গত ৪৫ বছরে বেপজার অধীনে থাকা ১০টি ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে মোট ৭২৯ কোটি মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এসব অঞ্চল থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৫ থেকে ২০ শতাংশের সমতুল্য। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইপিজেডগুলোর অবদান ছিল ১৭ শতাংশেরও বেশি। প্রতি একর জমি থেকে বছরে গড়ে ১৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে, যা বেপজার কার্যকারিতার একটি উল্লেখযোগ্য সূচক।
কর্মসংস্থানের দিক থেকে বেপজার সাফল্য আরও বেশি চোখে পড়ার মতো। প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যাদের একটি বড় অংশ নারী। পণ্য বৈচিত্র্য আনয়নের ক্ষেত্রেও বেপজা সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। যদিও ইপিজেডগুলোর ৪৫০টি কারখানার মধ্যে এক–তৃতীয়াংশ এখনো তৈরি পোশাক শিল্পের অন্তর্ভুক্ত, তবে বাকি কারখানাগুলো গাড়ির যন্ত্রাংশ, ক্যামেরার লেন্স, প্রিন্টারের টোনার, বাইসাইকেল, চশমার ফ্রেম, পরচুল (উইগ), জুতা এবং কফিনের মতো বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদন করছে।
নতুন উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ
বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ড্রোন তৈরির কারখানা গড়ে উঠছে, যা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এছাড়াও, অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় ব্যবহৃত বাইসাইকেল, বিশ্ব আর্চারি প্রতিযোগিতার তির এবং সেনাবাহিনীর অ্যান্টি–রেডিয়েশন ইউনিফর্মের মতো উচ্চমানের পণ্যও ইপিজেডগুলোতে তৈরি হচ্ছে।
বর্তমানে বেপজার অধীনে ৮টি ইপিজেড ও ২টি অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে, যার মোট আয়তন ৩ হাজার ৫৫০ একর। বিশ্বের ৩৮টি দেশ এসব অঞ্চলে বিনিয়োগ করেছে, যার মধ্যে চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, শ্রীলঙ্কা, কানাডা, মালয়েশিয়া, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান ও ডেনমার্ক উল্লেখযোগ্য। মোট ৫৬৪টি শিল্পকারখানার মধ্যে ৪৪৮টিতে উৎপাদন চালু রয়েছে এবং ১১৬টির নির্মাণকাজ চলমান।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সম্প্রসারণ
বেপজা তার কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। যশোর ও পটুয়াখালীতে দুটি নতুন ইপিজেড নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে, এবং চলতি বছরের মধ্যেই সেখানে প্লট বরাদ্দ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও রংপুর ও সিরাজগঞ্জে আরও দুটি প্রস্তাবিত ইপিজেড রয়েছে, যা দেশের শিল্পায়নকে আরও গতিশীল করবে।
বেপজার ৪৫ বছরের এই যাত্রা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তনেরও একটি দৃষ্টান্ত। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে সহায়তা করেছে।



