অর্থনৈতিক চাপে কোরবানি দিতে পারছেন না খামারিরা, কমছে পশু কোরবানি
অর্থনৈতিক চাপে কোরবানি দিতে পারছেন না খামারিরা

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার একটি কৃষক পরিবার প্রতিবছর পবিত্র ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি দিত। তিন বছর ধরে তারা কোরবানি দিচ্ছে না। পরিবারটির কর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেছেন, এক ভাগ কোরবানি দিতে এখন হাজার বিশেক টাকা লাগে। তাঁর গ্রামে এখন বিদেশে স্বজন থাকা পরিবার, ব্যবসায়ী, সরকারি চাকরিজীবীরাই মূলত কোরবানি দেন। কৃষকেরা দিতে পারেন না।

মূল্যস্ফীতির প্রভাব

সরকারি পরিসংখ্যানও বলছে, পশু ও মাংসের দাম বাড়ছে। অন্যদিকে কোরবানি কমছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, কোরবানির খরচ এখন আর স্বল্প আয়ের পরিবারের নাগালে নেই। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অতীতে কেউ কেউ কোরবানি দিতেন, এখন দিচ্ছেন না। যাঁরা একটি পশু কোরবানি দিতেন, তাঁদের অনেকে এখন ভাগে দিচ্ছেন। তবে একটি শ্রেণির কাছে টাকার অভাব নেই।

২০২০ সালে করোনা, ২০২২ সাল ও পরবর্তী উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বর্তমানে অর্থনীতিতে ভাটা মানুষকে আর্থিক চাপে ফেলেছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পশু কোরবানি দেওয়ার সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা গতবারের তুলনায় এবার মোটামুটি একই আছে, কিছু কিছু সূচক নিচের দিকে। সুতরাং এবার গত বছরের তুলনায় কোরবানি কম হতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মাংসের দাম বৃদ্ধি

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য, ২০১৪ সালে গরুর মাংসের গড় দাম ছিল প্রতি কেজি ২৭৫ টাকা। এর পর থেকে দাম বাড়ছে। কারণ, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে গরুর একটি বড় উৎস বন্ধ হয়ে যায়। ওই বছর এপ্রিলে ভারত সে দেশের সীমান্তরক্ষীদের উদ্দেশে বাংলাদেশে গরু ঢোকা পুরোপুরি বন্ধ করতে নির্দেশনা দেয়। ভারত গরু সরবরাহ বন্ধের পর বাংলাদেশে একের পর এক খামার গড়ে ওঠে। দেশীয়ভাবে গরু ও গরুর মাংসের জোগান বেড়েছে। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য তা যথেষ্ট নয়। এতে মাংসের দাম বাড়ছেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য, ঢাকার বাজারে এখন ১ কেজি গরুর মাংসের দাম ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা। গত বছর একই সময়ে ৭৮০ টাকার মধ্যে ছিল। গরুর সঙ্গে বেড়েছে ছাগল ও খাসির মাংসের দামও। বাজারে ১ কেজি খাসির মাংস কিনতে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা খরচ করতে হচ্ছে, যা এক বছর আগের তুলনায় ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি।

কোরবানির সংখ্যা কমছে

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের গত ৯ বছরের (২০১৭ থেকে ২০২৫) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট কিংবা মহামারির সময় পশু কোরবানি কমে। আর এমন পরিস্থিতি না হলে বাড়ে পশু কোরবানির সংখ্যা। ২০১৭ সাল থেকে ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি বাড়ছিল। ২০১৯ সালে পশু কোরবানি বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৬ লাখে। তারপর আর এত সংখ্যক পশু কোরবানি হয়নি দেশে।

২০২০ সালে দেখা দেয় করোনা মহামারি। স্বাস্থ্যসংকটের পাশাপাশি তা অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করে। অনেকের আয় কমে যায়, অনেকে চাকরি হারান। তেমন অবস্থায় ২০২০ সালের ১ জুন অনুষ্ঠিত হয় ঈদুল আজহা। আগের বছরের তুলনায় তখন ১১ লাখ ৬৪ হাজার পশু কম কোরবানি হয়। করোনা মহামারির মধ্যেই ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এই যুদ্ধেরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর ২০২৩ সালের ঈদুল আজহায় প্রায় ১ কোটি ৪২ হাজার পশু কোরবানি হয়। ২০২৪ সালে কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। এরপর গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার আমলে ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা নেমে আসে ৯১ লাখ ৩৬ হাজারে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. শাহজামান খান প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর কোরবানি নির্ভর করে। গত বছর হয়তো মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। এবার গণতান্ত্রিক সরকার আছে, সে কারণে হয়তো কোরবানি বেশি হবে।

উদ্বৃত্ত পশু নিয়ে প্রশ্ন

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কোরবানিযোগ্য প্রাণীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ৮০ হাজার। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে তা কমে হয় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার। এবার আরও কমে কোরবানিযোগ্য প্রাণীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। এবার কোরবানিযোগ্য গরু-মহিষের সংখ্যা ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮। গত বছরের তুলনায় সংখ্যাটি প্রায় ৯৩ হাজার বেশি। এবার মূলত কমেছে ছাগল-ভেড়ার সংখ্যা। গত বছরের তুলনায় এ বছর ২ লাখ ৬ হাজার ছাগল-ভেড়া কম রয়েছে। এ বছর কোরবানির জন্য প্রস্তুত আছে ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি ছাগল-ভেড়া।

নিজেদের হিসাব এমন হলেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দাবি করছে, এ বছর চাহিদার তুলনায় কোরবানিযোগ্য প্রাণীর সংখ্যা বেশিই রয়েছে। ফলে উদ্বৃত্ত থাকতে পারে ২২ লাখ ২৭ হাজার প্রাণী। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশু উদ্বৃত্ত থাকলে দাম এত বেশি হওয়ার কথা নয়। সরবরাহ যথেষ্ট থাকলে বাজারে দাম কমে যায়। সেটা সব কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেই দেখা যায়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানিয়েছে, তারা নিজেদের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কোরবানিযোগ্য প্রাণীর সংখ্যা হিসাব করে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে তথ্য-উপাত্ত পাঠানো হয়। একেকটি উপজেলায় আট থেকে নয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকেন। প্রাণিসম্পদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা কর্মীরা তথ্য সংগ্রহ করেন। খামার তাঁদের নিবন্ধিত থাকে। ফলে তাঁরা যে হিসাব দেন, সেটা সঠিক।

যদিও এই হিসাব নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পশু উদ্বৃত্ত থাকলে দাম এত বেশি হওয়ার কথা নয়। সরবরাহ যথেষ্ট থাকলে বাজারে দাম কমে যায়। সেটা সব কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। অধ্যাপক এ এইচ এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি হিসাবে কোরবানির প্রাণীর চাহিদা ও সরবরাহের যে তথ্য দেওয়া হয়, সেটা কতটা যথাযথ, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যদি হিসাব ঠিক হয়, সে ক্ষেত্রে কিছু কোরবানির প্রাণী অবিক্রীত থাকতে পারে। কারণ, উৎপাদন খরচ ওঠাতে না পেরে অনেক কৃষক বিক্রি না-ও করতে পারেন। আবার অনেক খামারি লাভ না করে উৎপাদন খরচ উঠলেই বিক্রি করে দেবেন। তাতে খামারির লোকসানের শঙ্কা রয়েছে।

পশুর হিসাব অন্য কোনো সংস্থা করে না। কিন্তু গরু ও গরুর মাংসের ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি বলছে, সরবরাহ যথেষ্ট নয়।