একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত চামড়া শিল্প এখন কাঠামোগত অনিশ্চয়তার মুখে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি আয়ের উৎস হলেও গত এক দশকে নানা প্রতিবন্ধকতায় জর্জরিত এই খাত।
ঋণ সংকট ও ব্যাংকগুলোর অনীহা
ঈদুল আজহার আগে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋণ প্রায় শুকিয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক অর্থবছরে মৌসুমি ঋণ বিতরণে তীব্র পতন দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো প্রায় ১২৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৬৫ কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ২৯৬ কোটি টাকা থাকলেও শিল্প সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, প্রকৃত বিতরণ ১০০ কোটি টাকার নিচে নেমে আসতে পারে।
ব্যাংকাররা জানান, চামড়া খাতের অধিকাংশ বড় ব্যবসায়ী খেলাপি হওয়ায় নতুন ঋণ অনুমোদন কঠিন হয়ে পড়েছে। রূপালী ব্যাংকের মোট ৭৬৭ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ৪৫৩ কোটি টাকা খেলাপি, আর বাকি ৩১৪ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হলেও নতুন ঋণের জন্য অযোগ্য। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, খেলাপি ঋণের কারণে ঋণ ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিতরণ অনিশ্চিত।
ট্যানারি মালিকদের বক্তব্য
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, সরকার লবণ বিতরণের মতো সহায়তা দিলেও পর্যাপ্ত ব্যাংক ঋণের অভাবে কাঁচা চামড়া সংগ্রহে সংকট তৈরি হবে। সংগঠনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জানান, এ মৌসুমে প্রায় এক কোটি পিস কাঁচা চামড়া সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা কার্যকরী মূলধন। ব্যাংক সহায়তার অভাবে ব্যবসায়ীরা নিজেদের সীমিত সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করছেন।
২০১৯ সালের ধস ও রপ্তানি পতন
২০১৯ সালের ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়ার বাজার ধসে পড়ে। সরকার নির্ধারিত মূল্যমান থাকলেও গ্রামীণ পর্যায়ে দাম নেমে যায় ২০০-৩০০ টাকায়। অনেক এলাকায় ক্রেতা না পেয়ে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। এ ঘটনার পর অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী বাজার ছেড়ে দেন।
আন্তর্জাতিক বাজারেও চামড়া খাতের অবস্থা ভালো নয়। সাভার ট্যানারি এস্টেটের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) অকার্যকর থাকায় স্থানীয় ট্যানারিগুলো লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাচ্ছে না। ফলে ইউরোপ-আমেরিকার ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনছে না; চীন এখন প্রধান ক্রেতা।
রপ্তানি আয়ের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২৭৭.৯ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি হলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১২৮.২ মিলিয়ন ডলারে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে রপ্তানি আয় ১০৮.৩ মিলিয়ন ডলার, অথচ খাতের মোট ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা।
সরকারের উদ্যোগ
বাজার অস্থিরতা ঠেকাতে সরকার কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে। ঢাকার মধ্যে লবণযুক্ত গরুর চামড়া ৬২-৬৭ টাকা, ঢাকার বাইরে ৫৭-৬২ টাকা, খাসির চামড়া ২৫-৩০ টাকা এবং বকরি ও ছাগলের চামড়া ২২-২৫ টাকা প্রতি বর্গফুট।
প্রাথমিক সংরক্ষণের জন্য মাদ্রাসা, এতিমখানা ও ওয়েলফেয়ার হোমে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিতরণ করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আঞ্চলিক মনিটরিং টিম গঠন করেছে, লবণবিহীন চামড়া পরিবহন নিষিদ্ধ করেছে এবং চামড়া পাচার ঠেকাতে বিজিবিকে সীমান্ত টহল জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে খাতটিতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তবে খেলাপি গ্রাহকদের জন্য নতুন ঋণ সীমিত।
তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও স্থানীয় মৌসুমি সংগ্রহকারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। নগদ অর্থে চামড়া কিনে তারা পাইকার ও ট্যানারির কাছে বিক্রি করেন। পর্যাপ্ত ঋণ সহায়তার অভাবে এবারও বাজার ধসের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।



