নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন, মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় চরম সংকট
যুদ্ধের প্রভাবে পরিবহণ খরচ ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে মধ্যবিত্তরা চরম চাপে পড়েছে। একদিকে ভোক্তার আয় কমেছে, অন্যদিকে দাম বৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রার মান কমাতে বাধ্য করছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই সংকট আগামীতে আরও গভীর হতে পারে, যা যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।
মূল্যস্ফীতি ও আয়ের বৈষম্য
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৮.৭১ শতাংশ ছিল, যার মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.২৪ শতাংশ। তবে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৮.০৯ শতাংশ, অর্থাৎ ভোক্তার আয় মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০.৬২ শতাংশ কম। এই ঘাটতি পূরণ করতে মানুষ ঋণ নিচ্ছে বা খরচ কমাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুষ্টিহীনতা ও শিক্ষার মান কমাতে পারে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু আয় একই হারে বাড়ছে না। মানুষ টিকে থাকতে সঞ্চয় ভাঙছে বা ঋণ করছে, কিন্তু দারিদ্র্যসীমার নিচের মানুষদের জন্য অবস্থা আরও ভয়াবহ।”
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সংকট
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবাহ সর্বনিম্নে পৌঁছেছে, ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না এবং বিদ্যমান চাকরিও ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে আয় কমার পাশাপাশি বেকারত্ব বাড়ছে, যা জীবনযাত্রাকে আরও নিম্নমুখী করে তুলছে।
আমদানি ব্যয় ও বাজার অস্থিরতা
ডলারের দাম বৃদ্ধি, জাহাজ ভাড়া ৬০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলে সরকার রেশনিং আরোপ করেছে, কিন্তু সিন্ডিকেটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাড়তি দামে তেল বিক্রি হচ্ছে, যার ফলে ট্রাক ভাড়া ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
খুচরা বাজারের দামের চিত্র
রাজধানীর খুচরা বাজারে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ২১০ টাকা, যা এক মাস আগে ১৮০ টাকা ছিল। সোনালি মুরগি ৪৩০-৪৪০ টাকা, গরুর মাংস ৮০০ টাকা, ভোজ্যতেলের লিটার ২১০-২২০ টাকা, এবং চিনি প্রতি কেজি ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবজির দামও ব্যাপক হারে বেড়েছে, যেমন গোল বেগুন ১২০ টাকা, পটোল ১০০ টাকা, এবং করলা ১০০-১২০ টাকা কেজি।
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, “যুদ্ধের কারণে ভোজ্যতেল আমদানিতে সমস্যা হচ্ছে এবং বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে, তাই দেশের বাজারেও দাম বাড়াতে হবে।”
পরিবহণ খরচ ও প্রভাব
ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির বলেন, “তেল সংকটের কারণে ট্রাকে তেল নিতে এক-দুই দিন সময় লাগে, এবং চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় ভাড়া ৫-৭ হাজার টাকা বেড়েছে। বগুড়া থেকে ঢাকায় ট্রাক ভাড়া এখন ১৮-২০ হাজার টাকা।” এই বৃদ্ধি সরাসরি পণ্যের দামে প্রভাব ফেলছে।
মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার চাপ
ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসিন্দা মো. মাসুম বলেন, “আমি মাসে ৪০ হাজার টাকা বেতন পাই, কিন্তু পরিবারের খরচ মেটাতে ৩৫ হাজার ৮৫০ টাকা লাগে। খরচ বহন করতে না পেরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছি।” রান্নার গ্যাসের দামও বেড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডার ১,৭২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু বাজারে ২,০০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।
তদারকি ও সমাধানের আহ্বান
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, “জ্বালানি সংকট ও সিন্ডিকেটের কারণে পণ্যের দাম বেড়েছে, তাই বাজারে কঠোর তদারকি দরকার।” জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বাজার শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রতিদিন অভিযান চালানো হচ্ছে এবং আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হচ্ছে।



