বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট: খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে বাংলাদেশের 'লাল' অবস্থান অব্যাহত
খাদ্য মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিপূর্ণ 'লাল' শ্রেণি থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ। প্রায় তিন বছর ধরে দেশটি এই অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যা গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত বিভিন্ন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। যদিও নভেম্বরের পর বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।
দীর্ঘস্থায়ী লাল অবস্থান
বিশ্বব্যাংক ১০ থেকে ১২ মাসের খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। সর্বশেষ ১০ মাস ধরে বাংলাদেশ লাল তালিকায় রয়েছে, যা নির্দেশ করে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি কমছে না। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পাশাপাশি আরও ১৩টি দেশ লাল শ্রেণিতে রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ইথিওপিয়া, মোজাম্বিক, অ্যাঙ্গোলা, ঘানা, মঙ্গোলিয়া, নাইজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইউক্রেন, জাম্বিয়া, বেলারুশ, কাজাখস্তান, মলদোভা ও রাশিয়া।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, "খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া বেশ উদ্বেগের বিষয়। মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা দেশের আমদানির ওপর প্রভাব ফেলবে, যা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।" তিনি আরও যোগ করেন, "পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় আমরা মূল্যস্ফীতি কমাতে বেশ ব্যর্থ হয়েছি। সরকারি সংস্থার হিসাবেই সাড়ে ৮–৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, যা এমনিতেই অনেক বেশি। বাস্তবে মূল্যস্ফীতি আরও বেশি হতে পারে।"
বিশ্বব্যাংকের শ্রেণিবিভাগ
বিশ্বব্যাংক খাদ্য মূল্যস্ফীতির মাত্রা অনুযায়ী দেশগুলোকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে:
- বেগুনি শ্রেণি: যেসব দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৩০ শতাংশ বা তার বেশি, সেগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
- লাল শ্রেণি: যেসব দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে, সেগুলো মোটামুটি ঝুঁকিতে রয়েছে।
- হলুদ শ্রেণি: ২ থেকে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির দেশগুলো এই শ্রেণিতে পড়ে।
- সবুজ শ্রেণি: ২ শতাংশের কম মূল্যস্ফীতির দেশগুলো সবুজ তালিকাভুক্ত।
মোট ১৭২টি দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা গত ১৩ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতির নির্দেশক। ফেব্রুয়ারি মাসে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যদি ১০০ টাকায় খাবার কেনা যায়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা ১০৯ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়াবে। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ টাকায় খরচ বেড়েছে ৯ টাকা ৩০ পয়সা। এটি ধনী-গরিব নির্বিশেষে গড় হিসাব, কিন্তু গরিব মানুষের আয়ের বড় অংশ খাবারে ব্যয় হয়, যা তাদের জন্য মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে।
অন্যান্য দেশের অবস্থা
বিশ্বব্যাংকের তালিকায় সবচেয়ে খারাপ শ্রেণি বেগুনিতে রয়েছে মালাউয়ি, যা টানা ৯ মাস ধরে এই অবস্থানে আছে। ইরান ও জাম্বিয়া আট মাস ধরে, এবং তুরস্ক ও আর্জেন্টিনা সাত মাস ধরে বেগুনি শ্রেণিতে রয়েছে। অন্যান্য দেশগুলো সময়ে সময়ে লাল, হলুদ বা সবুজ তালিকায় উঠানামা করছে, যা তাদের খাদ্য মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতির পরিবর্তন নির্দেশ করে।



