জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সত্ত্বেও পাম্পে দীর্ঘ লাইন: অর্থনীতিতে নতুন সংকটের আশঙ্কা
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও পাম্পে লাইন কমেনি, সংকট বাড়ছে

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি: অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানির দাম ও প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার গত রোববার অকটেনে ২০ টাকা, পেট্রলে ১৯ টাকা, কেরোসিনে ১৮ টাকা এবং ডিজেলে ১৫ টাকা দাম বাড়িয়েছে। জ্বালানি তেল কৌশলগত পণ্য হওয়ায় এর দাম বৃদ্ধি আলু, পটোল থেকে শুরু করে সব পণ্য ও সেবার দাম বাড়াবে, যা নতুন এক দফা মূল্যস্ফীতির সূচনা করতে পারে।

মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের প্রভাব

তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে সাধারণ মানুষ কায়দা করে বেঁচে থাকলেও এবারের ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি না বাড়ায় প্রকৃত আয় কমছে, ফলে নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তের বড় অংশ জীবনযাত্রার মান কমিয়ে চলেছেন। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে নতুন করে ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য রেখার নিচে নেমে যেতে পারে। গত অক্টোবরে দারিদ্র্যের হার ২৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা উদ্বেগজনক।

পাম্পে দীর্ঘ লাইন ও সরবরাহ সংকট

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পরও পেট্রলপাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন কমেনি। দেড় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে, যা স্বাভাবিক নয়। জ্বালানি না পাওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালকরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। গ্রাম ও মফস্বলে ৮-১০ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে, যা উৎপাদন ও আয়ে প্রভাব ফেলছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ঝুঁকি

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বোরো ধান উৎপাদনে সেচের জন্য ডিজেল প্রয়োজন। ডিজেল পেতে কৃষকদের দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। ২০০৮ ও ২০১৭ সালের অভিজ্ঞতা বলে ধানের উৎপাদন কমলে চালের দাম গুণিতক হারে বাড়ে। ইরান যুদ্ধ শুধু তেলের বাজার অস্থিতিশীল করেনি, বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকটও ডেকে আনতে পারে।

কালোবাজারি ও সরকারি সংস্থার ভূমিকা

জ্বালানিমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা তেল মজুত করে কালোবাজারি করছেন। বিভিন্ন জায়গায় খাট বা মাটির নিচে তেলের মজুত পাওয়া গেছে। এই কালোবাজারিরা রাজনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে, কিন্তু তাদের শাস্তি হচ্ছে না। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তাদের জন্য পুরস্কারস্বরূপ।

বিপিসির মুনাফা ও জনমনে প্রশ্ন

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) তেলের সরবরাহ বাড়িয়েছে, যা জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিপিসি কি নিজেদের মুনাফার জন্য তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল? দৈনিক সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের দাম বৃদ্ধিতে বিপিসির বাড়তি আয় ৭৮০ কোটি টাকা হবে। গত ১১ বছরে বিপিসি তেল বিক্রি থেকে ৫২ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যদিও গত দুই মাসে ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এই মুনাফা জনগণের কাজে না লাগলে এর অর্থ কী? বিপিসির কর্মীদের বছরে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রফিট বোনাস দেওয়া হয়েছে, যা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

উপসংহার

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলছে। মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদনে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং কালোবাজারি বন্ধ করা। অন্যথায়, এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।