আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে স্বাক্ষরিত বিদ্যমান ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে আসার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন শর্তে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন ঋণ প্যাকেজ নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে ঢাকা।
উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত
গত ২১ মে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল এবং আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্কের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের ভার্চুয়াল বৈঠকে এই নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়। রবিবার (২৪ মে) অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আইএমএফের চলমান কর্মসূচির অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য
বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আইএমএফের বিদ্যমান কর্মসূচিটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রণয়ন করা হয়েছিল। বর্তমান বাস্তবতায় আগের চুক্তির কিছু শর্ত বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, সরকার সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে চায় না। বরং দেশের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার কর্মসূচি নিতে চায়।
নতুন ঋণ কর্মসূচির পরিকল্পনা
এ প্রেক্ষাপটে নবনির্বাচিত সরকারের অধীনে আইএমএফের সঙ্গে একটি নতুন ঋণ কর্মসূচি চালুর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। নতুন প্রস্তাবিত কাঠামোয় তিন বছরের সময়সীমার মধ্যে অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। বৈঠকে আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নাইজেল ক্লার্ক বাংলাদেশের নতুন সংস্কার উদ্যোগ ও সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচিকে স্বাগত জানান। তিনি বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে ভবিষ্যতেও ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
পুরোনো চুক্তির অচলাবস্থা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, আইএমএফের বেশ কিছু কঠোর শর্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় সরকার পুরোনো চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। আইএমএফের পক্ষ থেকে সব ক্ষেত্রে অভিন্ন ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ, বিভিন্ন কর ছাড় প্রত্যাহার এবং বিদ্যুৎ ও সারে সর্বজনীন ভর্তুকির পরিবর্তে সরাসরি নগদ সহায়তা চালুর জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। এছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন আইন-২০২৬–এ সাম্প্রতিক সংশোধনী নিয়েও উন্নয়ন অংশীদারদের আপত্তি রয়েছে। তাদের মতে, এসব সংশোধন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
সরকারের অবস্থান
এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনস্বার্থ ও সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের বিরুদ্ধে যায়—এমন কোনও শর্ত মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আইএমএফ কর্মসূচি চালু থাকা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রতিবছর অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার পথও সহজ করে।
আগামী পদক্ষেপ
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, নতুন ঋণ কর্মসূচির পরিমাণ, সময়সীমা ও শর্ত চূড়ান্ত করতে আগামী জুলাই বা আগস্টে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে আসতে পারে।



