পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় আজ রোববার (৭ আষাঢ়) আলপালনি উৎসব উদ্যাপন করছেন চাষিরা। পাহাড়ি জুমচাষি ও হালচাষিরা প্রতিবছর এই দিনে চাষাবাদের কাজ বন্ধ রেখে ভালো ফলন কামনায় মাটি, পানি, আকাশ ও সূর্যের পূজা করেন। প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসায় এই দিন কুড়াল, কাস্তে ও নিড়ানিও বনের বৃক্ষ-লতা-গুল্ম কাটা থেকে বিরত রাখা হয়।
আলপালনি উৎসবের তাৎপর্য ও নামকরণ
চাকমা ভাষায় ‘আল’ অর্থ চাষ, আর ‘পালনি’ মানে পালন করা বা কাজে বিরত থাকা। আলপালনি অর্থ চাষের কাজে বিরতি পালন। মারমাদের কাছে এই উৎসব ‘ইফাইহ্লা’ এবং ত্রিপুরাদের কাছে ‘হালুপুলুং’ নামে পরিচিত। পাহাড়ি প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকৃতিকে ভালোবাসায় ৭ আষাঢ় পাহাড়ি চাষিরা হালচাষের কাজ থেকে বিরত থাকেন। এমনকি বনাঞ্চলের গাছ, বাঁশ, লতাগুল্ম কাটতেও যান না।
পূজা ও আচার-অনুষ্ঠান
এই দিনে মোরগ-মুরগি ও শূকর উৎসর্গ করে মাটি-পানি, আকাশ ও সূর্যের পূজা করা হয়। ভালো ফসল পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভক্তিসহকারে এই পূজা করা হয়। শুরুতে লক্ষ্মীদেবীর উদ্দেশে পূজা নিবেদন করা হয়। এরপর কলাপাতায় ভাত, তরকারি ও ফল-ফুল সাজিয়ে বাড়ির ছাদে আকাশকে, উঠানে মাটিকে, ঝিরি-ঝরনার তীরে পানিকে নিবেদন করা হয়। কৃষিকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম দা, কুড়াল, কাস্তে, নিড়ানি, লাঙল ধুয়ে-মুছে পবিত্র করে পূজা দেওয়া হয়।
বর্তমান অবস্থা ও উদ্যোগ
প্রবীণরা জানান, প্রকৃত অর্থে আলপালনি হলো—যে প্রকৃতি খাবারের জোগান দেয় সেই প্রকৃতির প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধায় একটি দিন উৎসর্গ ও পূজা করা। ৩৫ থেকে ৪০ বছর আগেও ঘরে ঘরে উৎসবমুখর পরিবেশে আলপালনি উদ্যাপন করা হতো। বিশেষ করে অবস্থাপন্ন পরিবারগুলো দেবদেবীর পূজার সঙ্গে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, আত্মীয়স্বজনকে ভোজের আমন্ত্রণ জানাতেন। বর্তমানে জুমচাষ ও হালচাষ কমে যাওয়া এবং পেশার পরিবর্তনের কারণে আলপালনি উৎসব তেমন পালন হয় না। অনেকেই কেবল সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে এই উৎসব উদ্যাপন করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাগড়াছড়ির মহালছড়ি ও রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেকে এখনো আলপালনি উৎসব পালন করা হয়। খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি মৌজার হেডম্যান (মৌজাপ্রধান) স্বদেশ প্রীতি চাকমা বলেন, ‘মহালছড়িতে সব জায়গায় নয়, দুর্গম এলাকাগুলোতে চাষিরা আলপালনি পালন করেন। আজকেও সেই সব এলাকায় উৎসব হচ্ছে।’
খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের (কেকেএসআই) পরিচালক ঞোহ্লামং মারমা বলেন, ‘ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে কয়েক বছর ধরে আলপালনি উৎসব উদ্যাপন করা হচ্ছে। এবার আগামী সপ্তাহে উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।’



