বিগত কয়েক দশকে উজানের পানি প্রত্যাহার, নদীর নাব্যতা হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন এবং লবণাক্ততার বিস্তারের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এক গভীর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে। একসময় যেসব নদী সারা বছর প্রবহমান ছিল, আজ সেগুলোর অনেকই শুষ্ক মৌসুমে মৃতপ্রায়। এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সম্প্রতি পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে, যা ইতিমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কেউ এটিকে বাংলাদেশের পানি, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ রক্ষায় সম্ভাব্য ‘গেমচেঞ্জার’ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল, পরিবেশগতভাবে জটিল ও ভূরাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ বলে মনে করছেন।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ও পরিকল্পনা
পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো বর্ষাকালে পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে তা নিয়ন্ত্রিতভাবে সরবরাহ করা। প্রকল্পের আওতায় রাজবাড়ীর পাংশায় প্রায় ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে, যেখানে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের দাবি, এই প্রকল্পের মাধ্যমে গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, নবগঙ্গা-ভৈরব এবং হরি-কপোতাক্ষসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হবে এবং লবণাক্ততা হ্রাস পাবে।
অতীতের ব্যারাজ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা
এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ হলেও এ প্রকল্প যে অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অনেকগুলো জটিল বিষয় একই সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে এবং অতীতের প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা ও ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব এবং পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকিগুলো ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে।
এর মধ্যে প্রথম হলো গঙ্গা-কপোতাক্ষ বা জিকে প্রকল্প (১৯৬২), যার মূল উদ্দেশ্য ছিল গঙ্গা নদী থেকে পানি এনে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদ কপোতাক্ষ অববাহিকায় প্রবাহিত করা। কিন্তু বাস্তবে কপোতাক্ষ নদে প্রত্যাশিত প্রবাহ সৃষ্টি হয়নি। পরে ভারতে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-পদ্মার প্রবাহ কমে যাওয়ায় জিকে প্রকল্পও পর্যাপ্ত পানি পেতে ব্যর্থ হয়।
এ ছাড়া খাল দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অবক্ষয় এবং নদী পুনঃখনন ও সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ফলে ‘গঙ্গা-কপোতাক্ষ’ নাম থাকলেও প্রকল্পটি কপোতাক্ষ নদকে পুনর্জীবিত করতে পারেনি; বরং এটি ধীরে ধীরে একটি সীমিত সেচ প্রকল্পে পরিণত হয়ে এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
দ্বিতীয়ত, তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল উত্তরাঞ্চলে সেচ সম্প্রসারণ। কিন্তু উজান থেকে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় প্রকল্পের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়নি। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় শুকিয়ে যায় এবং ভাটিতে পলি জমে নদী ক্ষীণ হয়ে যায়। এই উদাহরণ দেখায় যে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়; নির্ভরযোগ্য ‘আপস্ট্রিম ফ্লো’ (স্রোতের বিপরীত দিকের প্রবাহ) নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।
তৃতীয়ত, কাপ্তাই বাঁধ বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর ফলে বিশাল এলাকা প্লাবিত হয় এবং বহু পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গেও এ প্রকল্পের সম্পর্ক রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। এসব উদাহরণ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, নদী শুধু পানি বহন করে না; এটি পলি, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, ভূগর্ভস্থ পানি, নৌচলাচল, উপকূলীয় ভারসাম্য এবং মানুষের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
পদ্মা ব্যারাজের সম্ভাব্য ঝুঁকি
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করছে। পদ্মা ব্যারাজ সেই ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে। তবে তা সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে বিজ্ঞান, কূটনীতি, পরিবেশসচেতনতা এবং সুশাসনের সমন্বিত প্রয়োগের ওপর। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট, লবণাক্ততা এবং সেচ সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে এটি উপস্থাপিত হলেও এর সঙ্গে বহু জটিল পরিবেশগত, জলবিদ্যাগত, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি জড়িত রয়েছে।
অতীতের বিভিন্ন ব্যারাজ ও নদী নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ ধরনের প্রকল্প দীর্ঘ মেয়াদে নতুন সংকটও সৃষ্টি করতে পারে। তাই বড় পানি প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু প্রকৌশল নয়, পুরো অববাহিকা, ‘ডাউনস্ট্রিম ইকোলজি’, পলিপ্রবাহের গতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুঝুঁকির বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো পলি জমা। পদ্মা পৃথিবীর অন্যতম পলিবাহী নদী। পদ্মা নদী দিয়ে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পলি প্রবাহিত হয়। ব্যারাজ নির্মাণের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বিপুল পরিমাণ পলি ব্যারাজের উজানে জমা হতে পারে। এতে নদীর গভীরতা কমে গিয়ে নাব্যতা হ্রাস, জলাবদ্ধতা, বন্যা এবং নদীভাঙনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
দ্বিতীয় বড় ঝুঁকি হলো, ভাটির দিকে স্বাদুপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং তার ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়া। যদি শুষ্ক মৌসুমে ব্যারাজে অতিরিক্ত পানি আটকে রাখা হয় বা উজানে সেচের জন্য বেশি পানি প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে বরিশালসহ দক্ষিণ-মধ্য উপকূলীয় অঞ্চলে মিষ্টি পানির চাপ কমে যেতে পারে। এর ফলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি আরও ভেতরে প্রবেশ করবে এবং কৃষি, পানীয় জল, মৎস্যসম্পদ ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো উজানের পানিপ্রবাহের অনিশ্চয়তা। পদ্মা ব্যারাজের সাফল্য সম্পূর্ণ নির্ভর করবে ভারত থেকে শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাবে কি না তার ওপর। কিন্তু বিদ্যমান গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি অনুযায়ীও বাংলাদেশ বহু সময় তার ন্যায্য হিস্যা পায়নি। যদি ভবিষ্যতে উজানের প্রবাহ আরও কমে যায়, তাহলে ব্যারাজে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করাই কঠিন হয়ে পড়বে।
পদ্মা ব্যারাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো ভাটির পরিবেশ ও মৎস্যসম্পদের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, মৌসুমি পানি ওঠানামা এবং পলি পরিবহন মাছের প্রজনন, জলজ জীববৈচিত্র্য ও নদীকেন্দ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যারাজের কারণে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হলে মাছের চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হতে পারে, জলজ আবাসস্থলের পরিবর্তন ঘটতে পারে এবং ভাটির পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের নদী, মোহনা ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্পটির অর্থনৈতিক ঝুঁকিও অনেক বেশি। ব্যারাজের পাশাপাশি সংযোগ খাল, পাম্পিং ব্যবস্থা, ড্রেজিং, জলাধার ব্যবস্থাপনা এবং নদী পুনঃখননের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। উপরন্তু পলি জমার কারণে নিয়মিত ড্রেজিং চালিয়ে যেতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয়ের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় আরও বেশি হয়ে দাঁড়ায়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, পলি অপসারণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় দীর্ঘ মেয়াদে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এ ছাড়া নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা বা অন্য কোনো কারণে যদি কোনো বছরও প্রয়োজনীয় ড্রেজিং ও পলি অপসারণ ব্যাহত হয়, তাহলে পরবর্তী বছর সেই জমে থাকা পলি কার্যকরভাব অপসারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে।
আরেকটি উদ্বেগ হলো প্রকল্পের পানি ধারণক্ষমতা ও সেচের পানির পরিমাণের দাবির মধ্যে অসামঞ্জস্য। প্রকল্পে প্রায় ৩ বিলিয়ন ঘনমিটার (বিসিএম) পানি সংরক্ষণের কথা বলা হলেও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের হিসাব অনুযায়ী ২৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানসহ শুষ্ক মৌসুমের ফসলের সেচ দিতে প্রায় ২০ বিসিএম পানির প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পিত পানির পরিমাণ সম্ভাব্য সেচ চাহিদার তুলনায় অনেক কম। তা ছাড়া ব্যারাজ থেকে মাঠ পর্যন্ত পানি পৌঁছাতে ১৫–২০ শতাংশ পর্যন্ত পানি হারিয়ে যেতে পারে। ফলে ৩ বিসিএম সংরক্ষিত পানির মধ্যে কার্যকরভাবে কৃষিক্ষেত্রে পৌঁছাতে পারে ২.৪–২.৫৫ বিসিএম।
অন্যদিকে নদীর নাব্যতা রক্ষা, পরিবেশগত প্রবাহ, মৎস্যসম্পদের প্রজনন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নৌচলাচল বজায় রাখার জন্যও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি নদীতে প্রবাহিত রাখা প্রয়োজন। তাই সংরক্ষিত পানির বড় অংশ সেচে ব্যবহার করা হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে প্রকল্পের ঘোষিত সেচ–সুবিধা, নদী পুনরুজ্জীবন, নৌচলাচল উন্নয়ন এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ—সব লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন থেকে যায়।
সামাজিক ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ। বৃহৎ জলাধার, খাল ও অবকাঠামো নির্মাণের ফলে স্থানীয় মানুষ উচ্ছেদ, কৃষিজমি হারানো এবং জীবিকাগত পরিবর্তনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চল ও প্লাবনভূমি এলাকায় জলাধার নির্মাণ করা হলে স্থানীয় কৃষক, জেলে ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু প্রকৌশলগত নয়, সামাজিক ও অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনাও জরুরি।
কার্যকর সমাধান যা হতে পারে
পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ, একই সঙ্গে বড় ঝুঁকিও। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলে দেখা যায় যে শুধু একটি বড় পদ্মা ব্যারাজ দিয়ে পদ্মা, মেঘনা, গড়াই ও কপোতাক্ষে টেকসইভাবে প্রবাহ বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে। বরং একটি সমন্বিত অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা বেশি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এ ক্ষেত্রে যা করণীয় হতে পারে:
- পদ্মার মূল প্রবাহে বিশাল জলাধার তৈরির পরিবর্তে নদীর গতিপথের পাশে পুরোনো খাল, বিল, নিম্নাঞ্চল ও প্লাবনভূমিকে সংযুক্ত করে বহু ছোট ও মাঝারি আকারের জলাধার গড়ে তোলা যেতে পারে। বর্ষাকালে এসব জলাধারে পানি সংরক্ষণ করা হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে ধীরে ধীরে নদী ও সেচব্যবস্থায় সরবরাহ করা। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কম ব্যাহত হবে এবং পলি আটকে যাওয়ার ঝুঁকিও কমবে।
- রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মার পানি সরাসরি নদীতে আটকে না রেখে মহানন্দা–পদ্মা সংযোগ এলাকায় নিয়ন্ত্রিত পানি সংরক্ষণব্যবস্থা আত্রাই-পুনর্ভবা অববাহিকা, চলনবিল এবং অন্যান্য নিম্নাঞ্চলে বিকেন্দ্রীভূত জলাধারব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির কৃত্রিম পুনর্ভরণের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বাড়ানো যেতে পারে। এতে পদ্মার ওপর অতিরিক্ত সেচ চাপ কমবে এবং ভাটিতে বেশি পানি প্রবাহিত হতে পারবে।
- পদ্মা-মেঘনায় প্রবাহ বৃদ্ধি এবং দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীয় অবস্থানে রাখতে হবে। কারণ, বর্তমানে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবাহিত মোট মিষ্টি পানির সিংহভাগই ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ব্যবস্থা থেকে আসে, যেখানে গঙ্গা-পদ্মার অবদান তুলনামূলকভাবে কম। এ বাস্তবতায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনার অতিরিক্ত বর্ষার পানি সংরক্ষণ, নিয়ন্ত্রিত পানি ধারণ, আঞ্চলিক জলাধার নেটওয়ার্ক, নদী পুনরুজ্জীবন কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে একীভূত করার সুযোগ রয়েছে।
- প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হওয়া উচিত ‘সবার আগে নদীর জন্য পানি’। অর্থাৎ সেচের আগে পদ্মা, মেঘনা ও দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলোর জন্য ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহ আইনগতভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে তেঁতুলিয়া, পায়রা, কীর্তনখোলা, বিষখালী, বলেশ্বর, আড়িয়াল খাঁসহ দক্ষিণাঞ্চলের নদ–নদীগুলোতে মিষ্টি পানির চাপ বর্তমানের চেয়ে বেশি বজায় থাকে এবং এতে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
- বাংলাদেশের শক্তি শুধু পানি নয়, পলিও। নদীবাহিত পলি দক্ষিণাঞ্চলের ভূমি সৃষ্টি করে, উপকূলকে রক্ষা করে এবং প্লাবনভূমির উর্বরতা বজায় রাখে। তাই পলি আটকে রাখা নয়, বরং নিয়ন্ত্রিতভাবে প্লাবনভূমি ও উপকূলীয় অঞ্চলে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
- দীর্ঘ মেয়াদে পদ্মা, মেঘনা, গড়াই ও কপোতাক্ষের প্রবাহ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় শর্ত হলো উজানের প্রবাহ নিশ্চিত করা। পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ নির্মাণের ফলে ভারত বিভিন্ন অজুহাতে উজানের পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই গঙ্গা, তিস্তা ও বরাকের অববাহিকায় যৌথ পানি ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিনিময় এবং মৌসুমি পানি সংরক্ষণ নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
শেষ কথা
পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজ বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে; তবে এর সাফল্য কেবল একটি বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করবে না। প্রকল্পটির প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে পর্যাপ্ত উজানের প্রবাহ নিশ্চিত করা, নদীর স্বাভাবিক পানি ও পলি পরিবহন বজায় রাখা, পরিবেশগত প্রবাহ সংরক্ষণ, কার্যকর জলাধার ও পানি বণ্টনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং স্বচ্ছ ও বিজ্ঞানভিত্তিক পরিচালনার ওপর। তাই পদ্মা (গঙ্গা) ব্যারাজকে কোনো একক প্রকৌশল প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি সমন্বিত জাতীয় অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ড. মো. শাহজাহান কবীর সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)



