একটানা অতি ভারী বৃষ্টিতে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বেশ কিছু এলাকা পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে রাঙামাটির সঙ্গে খাগড়াছড়ির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি তলিয়ে গেছে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা-রাঙামাটির লংগদু-সাজেক সড়ক। সাজেক ইউনিয়ন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলায় হলেও সড়কপথে খাগড়াছড়ি হয়ে যেতে হয় পর্যটকদের।
সাজেকে আটকা ৬০০ পর্যটক
আজ বুধবার সকালে পাহাড়ি ঢলে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা-সাজেক সড়কের মাচালং, বাঘাইহাটসহ বেশ কিছু এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ায় সাজেকে অবস্থানরত সাড়ে চার শ পর্যটক আটকা পড়েছেন। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রশাসন। তবে আটকে পড়া পর্যটকেরা এর আগেই সেখানে যান। আজ তাঁদের ফেরার কথা থাকলেও সড়ক ডুবে যাওয়ায় ফিরতে পারেননি।
সাজেক থানা থেকে আটকে পড়া পর্যটকের সংখ্যা সাড়ে চার শর মতো দাবি করা হলেও রিসোর্টমালিকেরা বলছেন, আটকে পড়া পর্যটকের সংখ্যা ছয় শতাধিক হবে। সাজেক কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুপর্ণ দেব বর্মণ প্রথম আলোকে মুঠোফোনে বলেন, “সাজেক ও দীঘিনালা সড়কের মাচালং ও বাঘাইহাট এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে সকাল সাড়ে ১০টায় সাজেক থেকে কোনো পর্যটকবাহী গাড়ি ছেড়ে যেতে পারেনি। বর্তমানে ৬০০ পর্যটক সাজেকে অবস্থান করছেন।”
পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা
আটকে পড়া পর্যটকদের থাকা–খাওয়ার জন্য কী ব্যবস্থা করা হয়েছে, জানতে চাইলে সুপর্ণ দেব বর্মণ জানান, পর্যটকদের সাজেক ভ্যালিতে আজ দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করার অনুরোধ করা হয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে এবং যাতায়াতের পরিবেশ তৈরি হলে বিকেলে সেনাবাহিনীর সহায়তায় পর্যটকদের খাগড়াছড়ি সদরে ফিরিয়ে আনা হতে পারে। সেটি না হলে তাঁরা সাজেকে অবস্থান করবেন। সে ক্ষেত্রে পর্যটকদের কাছ থেকে কোনো ধরনের হোটেলভাড়া আদায় করা হবে না। কেবল পানির বিল দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত থাকতে পারবেন তাঁরা। খাওয়াদাওয়ার বিষয়েও সহায়তা করা হবে।
পর্যটকদের বিষয়ে জানতে চাইলে সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত সাড়ে ৪৫১ জন পর্যটকের আটকে পড়ার খবর পেয়েছেন তাঁরা। পর্যটকদের সহায়তা দিতে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।
পর্যটকদের বিষয়ে খোঁজ নিতে রিসোর্টগুলোতে প্রশাসন লোক পাঠিয়েছে বলে জানান রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, “ঠিক কতজন পর্যটক আটকা পড়েছেন, জানতে আমরা প্রতিটি রিসোর্টে লোক পাঠিয়েছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হচ্ছে। পানি কমে গেলে তাঁদের কীভাবে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই চেষ্টা চলছে।”
সড়ক ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
আজ সকাল ১০টায় খাগড়াছড়ির দীঘিনালার স্টিল ব্রিজ, বড় মেরুং, আটারকছড়া ও তেঁতুলতলা এলাকায় গিয়ে সড়কে কোমরসমান পানি দেখা গেছে। দীঘিনালা-লংগদু-সাজেক সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। সাজেকের মাচালং ও বাঘাইহাট এলাকায় নৌকা চলাচল করতে দেখা গেছে।
জানতে চাইলে দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিল পারভেজ বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসন জরুরি প্রস্তুতি নিয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মেডিক্যাল টিম, ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্টের সদস্যদেরও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উপজেলায় ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে মেরুং এলাকার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে সোমবার রাতে ২৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। তাদের খাবার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়ক বন্ধ
গতকাল সকাল থেকে খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের মহালছড়ি উপজেলার চব্বিশ মাইল, মাইসছড়ি ও কেরেঙ্গেনালা এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় ওই সড়কেও সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। মাইসছড়ি এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকায় যাত্রী ও শিক্ষার্থীদের হেঁটে চলাচল করতে হচ্ছে। সেচের নালার স্লুইসগেট বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে না পারায় পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে।
টানা বৃষ্টিতে জেলার চেঙ্গী, মাইনী নদীসহ বিভিন্ন খাল-ছড়ার পানি দ্রুত বাড়ছে। জেলা সদর, মহালছড়ি ও দীঘিনালার বিভিন্ন নিচু এলাকায় ইতিমধ্যে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। বসতবাড়ি ও সড়ক প্লাবিত হওয়ায় নিম্নাঞ্চলের মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক পরিবার গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে দেখা গেছে। বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে।
স্থানীয়দের দুর্ভোগ
খাগড়াছড়ি সদরের নিচের বাজার এলাকার রিনা বেগম নামের ৬০ বছরের এক নারী ব্যাগ নিয়ে চলে যাচ্ছেন বোনের বাড়িতে। তিনি বলেন, “ঘরের উঠান পর্যন্ত পানি এসেছে। যেকোনো সময় ঘরে পানি ঢুকবে। আমি অসুস্থ মানুষ, তাই পানি ঢোকার আগে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে বোনের বাড়িতে যাচ্ছি।”
দীঘিনালা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের বেলুন মেকার সুভূতি চাকমা বলেন, বেলা ১১টা পর্যন্ত আগের ১৮ ঘণ্টায় খাগড়াছড়ি জেলায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
পাহাড়ধসের ঝুঁকি
টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। মহালছড়ি-গুইমারা সড়কের সিন্দুকছড়ি এলাকায় ছোট আকারের পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে অনুরোধ করেছে। জেলা শহরের শালবন, মোহাম্মদপুর, সবুজবাগ, কুমিল্লা টিলা, কলাবাগান, নুনছড়িবাজার, মোল্লাপাড়া, কৈবল্যপিঠ ও আঠারো পরিবার এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী মানুষকে বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, জেলার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ মোট ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনা খাবারসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যান্য এলাকায় বন্যা
অতিবৃষ্টির কারণে জেলার অন্যান্য উপজেলার নিম্নাঞ্চলও প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জাকির হোসেন জানান, টানা বৃষ্টির ফলে জুরাছড়ি উপজেলার ঘিলাতলী এলাকা এবং বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া বাজার ও গোয়াইনছড়ি এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তবে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে বিলাইছড়ির দুর্গম বড়থলি ইউনিয়নের সর্বশেষ খবরাখবর নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।



