যুদ্ধবিগ্রহের অভিঘাতে জ্বালানি ও সারের সংকট বাংলাদেশের ন্যায় কৃষিনির্ভর দেশগুলিকে ঠেলিয়া দিতেছে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে। এই সকল দেশে একদিকে ডিজেলের অভাবে সেচকাজ বিঘ্নিত হইতেছে, অন্যদিকে রাসায়নিক সারের ঘাটতিতে ব্যাহত হইতেছে উৎপাদন-এই দ্বৈত সংকটে নিমজ্জিত কৃষকরা যখন দিশাহারা, ঠিক সেই মুহূর্তে চোখ রাঙাইতেছে 'লোডশেডিং'। বিদ্যুতের এহেন ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি ঘটিয়া কৃষকের নিকট চাষাবাদ ক্রমেই অনিশ্চিত ও অলাভজনক হইয়া উঠিবে স্বাভাবিকভাবেই।
সরবরাহ শৃঙ্খল ভাঙনের আশঙ্কা
সেইরূপ অবস্থায় সাপ্লাই চেইন ক্রমশ ভাঙিয়া পড়িয়া আমদানিনির্ভর কৃষি সমাজগুলির সংকট বহুগুণ তীব্র হইবে। আর ইহা কেবল অর্থনৈতিক সংকট নহে; বরং খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ জীবনযাত্রা এবং সামগ্রিক অর্থনীতির উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করিবে। বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ক্ষুধা ও দারিদ্র্য লইয়া যেই ঘোরতর আশঙ্কার কথা বলিয়াছে, তাহা যেন কৃষিপ্রধান সমাজগুলির ঘুম হারাম করিয়া দিতেছে। ইহার কারণ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বলিতেছে, রাসায়নিক সারের ঘাটতি সরাসরি ফলন কমাইয়া খাদ্যনিরাপত্তাকে ফেলিয়া দেয় হুমকির মুখে। আবার, জ্বালানির সংকট বা মূল্যবৃদ্ধি সেচব্যবস্থাকে করিয়া তোলে ব্যয়বহুল।
বাংলাদেশের বিশেষ প্রভাব
বাংলাদেশের ন্যায় ক্ষুদ্র কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ইহার অভিঘাত কতটা তীব্রতর হইতে পারে, তাহা সহজে অনুমেয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের সেচনির্ভর জেলাগুলি-বিশেষত রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী-এই সকল অঞ্চলে ইতিমধ্যে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের ফলে সেচ ব্যাহত হইবার খবর পাওয়া গিয়াছে। অনেক কৃষক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমিতে সেচ দিতে না পারায় বোরো ধানের উৎপাদনও হুমকির সম্মুখীন। দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলের লবণাক্ততা মোকাবিলার জন্য অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন হয়, কিন্তু জ্বালানি সংকটে সেই সেচ ব্যাহত হওয়ায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি বাড়িতেছে। যথাসময়ে জমিতে সারের ব্যবস্থা না করিতে পারিলে যখন ফলন অবধারিতভাবে কমিয়া যায়-ইহা জানিবার পরও কৃষকরা অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হইতেছেন নির্ধারিত পরিমাণের চাইতে কম সার প্রয়োগ করিতে, যাহা দীর্ঘ মেয়াদে মাটির উর্বরতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করিবে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও অন্যান্য দেশের উদ্যোগ
এই সংকট মূলত বৈশ্বিক। ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশও রহিয়াছে অস্বস্তিতে। তবে সংকট মোকাবিলায় তাহাদের অনেকেই কার্যকর কৌশল গ্রহণ করিতেছে বা করিবার কথা ভাবিতেছে। উদাহরণস্বরূপ, চীন রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করিয়া জৈব ও দক্ষ কৃষিপদ্ধতির দিকে অগ্রসর হইতেছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পুনর্জীবনশীল কৃষি পদ্ধতি গ্রহণ করিয়া কম সম্পদ ব্যবহার করিয়াও উৎপাদন বজায় রাখিবার পথ খুঁজিতেছে। আফ্রিকার কিছু দেশে সৌরশক্তিনির্ভর সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ করিয়া জ্বালানিনির্ভরতা হ্রাসের উদ্যোগ গ্রহণ করা হইয়াছে। অনুরূপভাবে, অপচয় ও দুর্নীতি লাঘবে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত সরাসরি কৃষকের নিকট ভর্তুকি পৌঁছাইবার জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করিয়াছে।
বাংলাদেশের উত্তরণের পথ
বাংলাদেশের জন্য উত্তরণের পথ সুস্পষ্ট বটে, কিন্তু বাস্তবায়নই এইখানে মূল চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, সারের সরবরাহ ও বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করিতে হইবে; বাড়াইতে হইবে ডিজিটাল নজরদারি। দ্বিতীয়ত, জৈব সার ও বিকল্প পুষ্টি ব্যবস্থার প্রসার ঘটাইতে হইবে। তৃতীয়ত, সৌরশক্তিচালিত সেচপাম্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমাইতে হইবে। চতুর্থত, মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমাইতে কৃষকের নিকট সরাসরি প্রণোদনা পৌঁছাইবার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলিতে হইবে।
সুবিশাল দৃষ্টিভঙ্গি: সংকট থেকে সুযোগ
সার্বিকভাবে বলিতে হয়, এই সংকট বিশ্বকে মূলত এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করাইয়া দিয়াছে যে, আমদানিনির্ভর কৃষিকাঠামো দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই নহে। এমতাবস্থায়, আমদানিনির্ভরতা কমানো, জৈব ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির প্রসার ঘটানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধিসহ কৃষিতে 'নীতিগত সংস্কার'-এই ধরনের বহুমুখী স্তম্ভের উপর দাঁড়াইয়া তবেই কৃষিকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করিতে হইবে। বিশ্ব যখন গভীর খাদ্যসংকটের মুখে উপনীত, তখন কৃষির উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করিবার বিকল্প আর কী থাকিতে পারে? অতএব, এই সংকটকে কেবল দুর্ভোগ বলিয়া না দেখিয়া, ইহাকে একটি রূপান্তরের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই হইবে বিচক্ষণতা।



