২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালটা ছিল স্বাভাবিক। সাভারের রানা প্লাজার ভেতরে পোশাক শ্রমিকরা কাজে যোগ দিচ্ছিলেন। কেউ জানতেন না, কয়েক মিনিট পরই তাদের জীবন ওলটপালট হয়ে যাবে। হঠাৎ আটতলা ভবনটি কেঁপে উঠে ধসে পড়ে, মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ১১৩৬ জন শ্রমিক, আহত হন কয়েক হাজার। ধুলা, কংক্রিট আর চিৎকারে ভরে যায় এলাকা। উদ্ধারকাজ চলে দিনের পর দিন, কিন্তু ফিরে আসে শুধু নিথর দেহ আর ভাঙা স্বপ্ন।
বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা
ঘটনার ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার এখনও শেষ হয়নি। ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। ২০১৬ সালে শুরু হয় বিচারিক কার্যক্রম। শুরুতে দ্রুত বিচারের আশা থাকলেও বাস্তবতা উল্টো পথে হাঁটে। একের পর এক আইনি জটিলতা, উচ্চ আদালতে আবেদন, সাক্ষ্যগ্রহণে ধীরগতি মামলাটিকে দীর্ঘ সময়ের ফাঁদে আটকে রাখে।
সাক্ষীদের উপস্থিতি নিয়ে জটিলতা
হত্যা মামলায় সাক্ষী করা হয় ৫৯৪ জনকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ১৪৫ জন। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের আদালতে উপস্থিত করতে বারবার আদেশ দিলেও পুলিশ তা নিশ্চিত করতে পারছে না। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ৬ মাসের মধ্যে মামলা শেষ করতে নির্দেশ দিলেও তাতে কর্ণপাত করেননি সাক্ষী, পুলিশ, বিচারক কেউই। ফলে বিচার প্রক্রিয়া আজও অনিশ্চয়তার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।
নিহত ও আহতদের পরিবারের দাবি
দীর্ঘ অপেক্ষায় বদলে গেছে অনেক জীবন। কেউ হারিয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে, কেউ নিজেই হয়েছেন আহত, যাদের অনেকেই আজও পুরোপুরি সুস্থ নন। রানা প্লাজার সামনে দাঁড়ালে এখনো ভেসে ওঠে সেই দিনের কান্না, ধ্বংস আর অসহায়তার ছবি। এদিকে মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার আসামি সোহেল রানার পক্ষের আইনজীবীরা দাবি করছেন, তিনি নির্দোষ এবং অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে।
আগামী শুনানি ও স্মরণ অনুষ্ঠান
আগামী ৩০ এপ্রিল মামলায় ফের সাক্ষ্যগ্রহণ হওয়ার কথা। রাষ্ট্রপক্ষ যদি সাক্ষী হাজির করতে পারে, তবেই মামলাটি নিষ্পত্তির দিকে এগিয়ে যাবে। এদিকে, সাভারে রানা প্লাজা ধসে নিহত শ্রমিকদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন আহত শ্রমিক, স্বজন, শিল্প পুলিশ ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। শুক্রবার সকালে ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এসময় আহত ও নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তারা। পাশাপাশি শ্রমিক হত্যার সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায় বিভিন্ন সংগঠন। সকালে দিবসটি উপলক্ষ্যে রানা প্লাজার সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে শ্রমিক সংগঠনগুলো।



