প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষিপণ্য বহুমুখীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ‘স্মার্ট কৃষি’ কার্যক্রম বাস্তবায়নে একগুচ্ছ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ১৪ এপ্রিল ‘কৃষক কার্ড’ উদ্বোধন করা হয়। এ কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি ১০টি ভিন্ন ধরনের সেবা পাবেন।
বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আউয়ালের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব তথ্য জানান। অধিবেশনের ১৯তম দিন বিকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সভাপতিত্ব করেন।
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ১০টি সেবা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমির পরিমাণ হ্রাস এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে কৃষিখাত। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে কৃষক কার্ড উদ্বোধন করা হয়। এ কার্ডের মাধ্যমে ১০টি সেবা—ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ বিতরণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা প্রদান, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ, ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ, কৃষি বীমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষি পণ্য বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য প্রাপ্তিসহ ফসলের রোগ-বালাই দমনের পরামর্শ ইত্যাদি কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষক এ কার্ড পাবেন।
সরকারের সময়োপযোগী পরিকল্পনা
তিনি আরও জানান, কৃষির উন্নয়নে বর্তমান সরকার আরও বিভিন্ন সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেগুলো হলো—
প্রথমত: উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি
কৃষি উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সরকার উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল বীজ, সুষম সার ব্যবহারের পাশাপাশি আধুনিক সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। ইতোমধ্যে ২০ হাজার কি. মি. খাল খননের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি দিয়ে ট্রাক্টর, হারভেস্টার, রিপারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
দ্বিতীয়ত: পতিত জমি আবাদ ও ক্রপ জোনিং
পতিত জমি আবাদের আওতায় আনা এবং জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও পরিবেশের উপযোগী ফসল নির্ধারণ করা হয়। ফলে জমির অপচয় কমে এবং উৎপাদন বাড়ে। একই সঙ্গে পতিত জমি চিহ্নিত করে সেগুলো আবাদের আওতায় আনার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যেমন খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করে পতিত জমি কৃষির আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ। এছাড়া, সিলেট অঞ্চলে পতিত জমিসহ চরাঞ্চলের পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনার জন্য বিশেষ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
তৃতীয়ত: কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ
কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এক সময় ধান নির্ভর কৃষি ব্যবস্থা এখন ধীরে ধীরে ফল, সবজি, ডাল, তেলবীজ, মসলা, ফুল চাষ খাতে সম্প্রসারণ করার জন্য সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
চতুর্থত: প্রণোদনা ও সহায়তা
কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও সহায়তা কার্যক্রম স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের বীজ, সার, কৃষিযন্ত্র ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি দেওয়া হবে। তাছাড়া, স্বল্প সুদের কৃষিঋণ এবং ফসল বীমা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্যও বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। দেশের ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিদের কল্যাণে প্রতি অর্থবছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেটের ‘কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা’ খাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতে ৭শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সেখান থেকে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণ বাবদ ৪০১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে। এতে ২৫ লাখ ২২ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক উপকৃত হয়েছেন।
পঞ্চমত: সংরক্ষণ ও রপ্তানি
কৃষিপণ্য সংরক্ষণে আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নির্মাণ করা হচ্ছে। এছাড়া ফল ও সবজি সংরক্ষণের জন্য মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য এয়ার ফ্লো মেশিন বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষিপণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে, উত্তরাঞ্চলে কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ষষ্ঠত: গবেষণা ও উদ্ভাবন
কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে সরকার ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি), বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মাধ্যমে অধিক ফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী এবং স্বল্পমেয়াদি নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু সহনশীল ফসল উদ্ভাবনে জোর দেওয়া হচ্ছে, যাতে পরিবর্তিত পরিবেশেও কৃষি উৎপাদন বজায় থাকে।
সপ্তমত: জলবায়ু স্মার্ট কৃষি
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ‘ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি’ বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। লবণাক্ততা, খরা ও বন্যা সহনশীল ফসল চাষ, পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং টেকসই কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষিকে পরিবেশবান্ধব করা; কম সেচ, কম রাসায়নিক সার ও কম কীটনাশক প্রয়োগের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন; প্রি-পেইড মিটার স্থাপন এবং সেচের পর্যায়ক্রমিক ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতি প্রয়োগ করে খরাপ্রবণ অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা; মোবাইল অ্যাপ যেমন: ‘খামারি অ্যাপস’ ব্যবহার করে স্থানভিত্তিক উপযুক্ত ফসল চাষ করে সেচ, সারসহ অন্যান্য উপকরণের সর্বোত্তম ব্যবহার; প্রিসিশন এগ্রিকালচার ইত্যাদির জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।



