ঈদের পরদিন রাজশাহীর একটি মসজিদের ইমামের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, আসরের আগে একটি গরুর চামড়া ৭৭০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। সন্ধ্যার পর একই মানের আরেকটি চামড়া দিতে হয়েছে ৪০০ টাকায়। কথাটা তিনি ক্ষোভ নিয়ে বলেননি, বরং এমনভাবে বলেছেন যেন এটাই স্বাভাবিক। আসলে সমস্যাটা সেখানেই। কোনও অস্বাভাবিকতা যখন বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে, তখন একসময় মানুষ সেটাকেই নিয়তি হিসেবে মেনে নিতে শেখে।
এবারও ঈদের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একই দৃশ্য দেখা গেছে। কোথাও চামড়া রাস্তায় পড়ে আছে, কোথাও খোলা মাঠে নষ্ট হচ্ছে, কোথাও আবার নদী বা খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে। অথচ এমন হওয়ার কথা ছিল না। সরকার আগেভাগেই প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। মাদ্রাসা ও এতিমখানার জন্য বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, সচেতনতামূলক প্রচারণা, মাঠপর্যায়ে মনিটরিং—সব কিছুর ব্যবস্থা ছিল। তারপরও চামড়া নিয়ে প্রতি বছরের একই সংকট ফিরে এসেছে।
প্রশ্ন হলো, সমস্যাটা কোথায়? অনেকেই মনে করেন, এটি কেবল দামের সমস্যা নয়। বাস্তবে বিষয়টি তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। কারণ ঈদের পর চামড়ার যে মূল্যহীনতার ছবি আমরা দেখি, তার শিকড় বাজার ব্যবস্থাপনা, শিল্পনীতি, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার মধ্যে ছড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের বর্তমান অবস্থা
বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক ২২ থেকে ২৫ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হয়। এর প্রায় ৬০ শতাংশ আসে কোরবানির ঈদের মাত্র কয়েক দিনে। আন্তর্জাতিক বাজারে এই কাঁচামালের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দেশের বাজারে উৎপাদক পর্যায়ে এর মূল্য সেই সম্ভাবনার সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সরকার প্রতি বছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। ২০২৫ সালেও ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব সমস্যা হচ্ছে, কোরবানিদাতা বা মসজিদ-মাদ্রাসা যে কাঁচা চামড়া বিক্রি করেন, সেই পর্যায়ে কার্যকর কোনও মূল্য নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে সরকার যে দাম ঘোষণা করে, মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।
এখানেই সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। কাগজে-কলমে একটি মূল্য থাকে, কিন্তু বাস্তব বাজারে সেটি প্রায় অদৃশ্য। চট্টগ্রামের আড়তদারদের সংগঠনের নেতারা বহুবার অভিযোগ করেছেন, ট্যানারিগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি নির্ধারিত দামে চামড়া কেনে না। অন্যদিকে আড়তদারদের সামনে সময়ের চাপ থাকে। চামড়া বেশিদিন মজুত রাখা যায় না। ফলে শেষ পর্যন্ত তারা যে দাম পান, সেটাই মেনে নিতে বাধ্য হন।
ট্যানারি স্থানান্তর ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ
কিন্তু সংকটের মূল কারণ আরও গভীরে। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা। বাস্তবে সেই লক্ষ্য এখনও পূর্ণ হয়নি। সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারি এখনো আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ পায়নি। এর প্রভাব সরাসরি রফতানি বাজারে পড়েছে।
একসময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশের চামড়ার ভালো চাহিদা ছিল। কিন্তু পরিবেশগত মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার পর সেই বাজারের বড় অংশ হাতছাড়া হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু এলডব্লিউজি সনদের অভাবেই বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত রফতানি সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যও একই সংকেত দিচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। গত কয়েক বছরের প্রবণতা দেখলে বোঝা যায়, এটি কোনও সাময়িক ধাক্কা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সংকটের প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন দাম কমে বা বাজার সংকুচিত হয়, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার ওপর। কারণ মূল্যশৃঙ্খলের সবচেয়ে দুর্বল অংশ তারাই।
এতিমখানা ও মাদ্রাসার উপর প্রভাব
এতিমখানার প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একসময় দেশের বহু এতিমখানা ও কওমি মাদ্রাসার বার্ষিক আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসত কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে। সেই অর্থ দিয়ে শিক্ষার্থীদের খাবার, পোশাক, বইপত্র কিংবা আবাসন ব্যয়ের একটি অংশ মেটানো হতো। এখন অনেক প্রতিষ্ঠানই আর চামড়ার আয়ের ওপর নির্ভর করে না। কারণ তারা জানে, এই খাত থেকে আগের মতো অর্থ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়। এটি সামাজিক নিরাপত্তার একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভেঙে পড়ার গল্প। অন্যদিকে মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের অবস্থাও ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে চামড়াকেনার দৃশ্য ছিল পরিচিত। ধারাবাহিক লোকসান, বাজার অনিশ্চয়তা এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। নতুন উদ্যোক্তারাও আগ্রহ হারাচ্ছেন।
সমাধানের পথ
সমাধান অবশ্যই আছে, তবে সেটি ঈদের আগের কয়েক দিনের প্রশাসনিক তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রথমত, কোরবানির চামড়া কেনাবেচায় একটি ডিজিটাল নিলাম ও ট্রেডিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা সরাসরি প্রতিযোগিতামূলক দর পায়। দ্বিতীয়ত, জেলা পর্যায়ে আধুনিক সংরক্ষণ ও সংগ্রহ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, যাতে ঈদের দিনই কম দামে বিক্রি করার বাধ্যবাধকতা না থাকে। তৃতীয়ত, কাঁচা চামড়া রপ্তানির পরিবর্তে চামড়াজাত পণ্যে মূল্য সংযোজন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সাভারের সিইটিপি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করে এলডব্লিউজি সনদ অর্জনকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এতিমখানা ও মাদ্রাসার স্বার্থ রক্ষায় একটি ন্যূনতম মূল্য গ্যারান্টি বা বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন করা, যাতে বাজার ব্যর্থতার পুরো বোঝা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশকে বহন করতে না হয়।
ঈদের পর যে চামড়া রাস্তায় পড়ে থাকে বা নদীতে ভেসে যায়, সেটি শুধু একটি পণ্য নয়। সেটি হারিয়ে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা, নষ্ট হয়ে যাওয়া অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং সবচেয়ে বড় কথা, সমাজের দুর্বল মানুষের একটি ন্যায্য অধিকার।
যে সম্পদ এতিমখানা ও মাদ্রাসার কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল, সেটি যদি বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা, নীতিগত ব্যর্থতা এবং বাজারের অসাম্যের কারণে মূল্য হারায়, তাহলে ক্ষতিটা শুধু একটি শিল্পের নয়, পুরো সমাজের। চামড়ার দাম নিয়ে আমরা প্রতি বছর আলোচনা করি। কিন্তু আরও জরুরি একটি প্রশ্ন খুব কমই করি, কোরবানির এই সম্পদ কি সত্যিই তার প্রাপকের কাছে পৌঁছাচ্ছে?
যতদিন এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর মিলবে না, ততদিন রাস্তায় পড়ে থাকা প্রতিটি চামড়া আমাদের মনে করিয়ে দেবে— কোথাও না কোথাও একজন এতিম তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক



