ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে এবার প্রত্যাশিত পর্যটকের সমাগম হয়নি। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাখো পর্যটক আসবেন এমন আশায় প্রস্তুতি নিয়েছিল পর্যটন খাত। কিন্তু ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার পরও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। গত বছরের তুলনায় এবার পর্যটকের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়ায় হতাশা নেমে এসেছে পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
পর্যটক কম থাকায় ব্যবসায় মন্দা
সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী, ইনানী ও হিমছড়ি এলাকায় পর্যটকদের দেখা মিললেও অতীতের ঈদগুলোর মতো উপচেপড়া ভিড় নেই। অনেক হোটেল ও রিসোর্টে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কক্ষ খালি রয়েছে। পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, গত বছরের ঈদুল আজহায় ছুটি শুরুর কয়েক দিন আগেই অধিকাংশ হোটেল প্রায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু এবার ঈদের আগের দিন পর্যন্তও অনেক হোটেলে পর্যাপ্ত বুকিং পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ এবং দীর্ঘ ছুটির অভাব পর্যটক কম আসার অন্যতম কারণ। ঈদ উপলক্ষে বাড়তি খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক পরিবার এবার ভ্রমণ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে।
ব্যবসায়ীদের হতাশা
সৈকত এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, গত বছরের তুলনায় বিক্রি অনেক কম। পর্যটক কম থাকায় খাবারের দোকান, বিচ বাইক, ফটোগ্রাফি, শুটকি ও বার্মিজ পণ্যের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসায় প্রত্যাশিত গতি নেই। ঈদ মৌসুমকে কেন্দ্র করে যারা অতিরিক্ত কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন হতাশ।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের (টুওয়াক) সাধারণ সম্পাদক আখতার নুর বলেন, পর্যটন খাতে সরকারি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে পর্যটন খাতের জন্য স্বতন্ত্র কোনো মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়নি। এটি বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে মাত্র। ফলশ্রুতিতে পর্যটনশিল্প এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে। হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও।
তিনি বলেন, এবার ঈদে কক্সবাজারসহ দেশের কোনো পর্যটনকেন্দ্রেই আশানুরূপ পর্যটক আসেনি। এর অন্যতম কারণ সরকারি অব্যবস্থাপনা, পর্যটন খাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাব, পর্যটন স্পটগুলোতে বিনোদনের সীমাবদ্ধতা এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন। এছাড়া দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দাও একটি বড় কারণ।
হোটেল বুকিং কম
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, গত বছর এবং তার আগের বছরের তুলনায় এবার আগাম বুকিং কম ছিল। আমরা ধারণা করেছিলাম, ঈদের আগে থেকেই ব্যাপক পর্যটক আসবে। কিন্তু বাস্তবে সে রকম হয়নি। তবে ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে কিছু পর্যটক আসতে শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, সব মিলিয়ে এবার ঈদুল আজহায় ৭০-৮০ শতাংশ বুকিং হতে পারে। সেটিও মাত্র দুই দিনের জন্য। অনেক হোটেলে আবার সেই হারও অর্জিত হয়নি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভ্রমণে পরিবর্তন
পর্যটন খাতের একাধিক উদ্যোক্তার মতে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মানুষের মধ্যে ভ্রমণ ব্যয় কমানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আগে যেখানে পরিবার নিয়ে তিন থেকে চার দিনের জন্য কক্সবাজারে আসতেন, এখন অনেকেই এক বা দুই দিনের মধ্যে ভ্রমণ শেষ করছেন। ফলে পর্যটকের উপস্থিতি থাকলেও পর্যটন অর্থনীতিতে তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম পড়ছে।
পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, কক্সবাজারে পর্যটক কম আসার বিষয়টি শুধু একটি মৌসুমি সমস্যা নয়। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, পরিবহণ ব্যয়, পর্যটন খরচের ঊর্ধ্বগতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কিত। ফলে পর্যটন খাতকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার
এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সৈকতজুড়ে বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ, র্যাব, কোস্টগার্ড ও লাইফগার্ড সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। সমুদ্রের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যটকদের সতর্ক করতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুর মান্নান বলেন, ঈদ উপলক্ষে কক্সবাজারে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যটকেরা যাতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারেন, সেজন্য প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।



