ফ্যামিলি কার্ড: দেশজুড়ে ৫৩ হাজারের বেশি পরিবার পাচ্ছে সুবিধা
ফ্যামিলি কার্ড: দেশজুড়ে ৫৩ হাজারের বেশি পরিবার পাচ্ছে সুবিধা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ফ্যামিলি কার্ডের ঘোষণা দিয়ে আলোচনার জন্ম দেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে নতুন সরকার। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুতই চালু করা হয় ফ্যামিলি কার্ড। এর পাশাপাশি গত দুই মাসে আরও কয়েকটি নতুন কার্ড বা কার্ডভিত্তিক উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে।

ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের অগ্রগতি

এখন পর্যন্ত মোট ৫৩ হাজার ৯৬টি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। প্রান্তিক, হতদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা ও খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে পর্যায়ক্রমে সারাদেশে প্রায় ৪ কোটি পরিবারকে এই কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

গত ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এর মধ্য দিয়ে আড়াই হাজার টাকা নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়, যা সরাসরি কার্ডধারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। তবে এই কার্ড সবার জন্য নয়। মূলত হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারের নারীরা এ সুবিধা পাচ্ছেন। ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্য থাকা পরিবার, হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবার অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যান্য কার্ড উদ্যোগ

এ ছাড়া কৃষক কার্ড দেওয়া হচ্ছে। পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে এই কার্ড। এর মাধ্যমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণসহ ১০ ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার আইডি কার্ড, ই-হেলথ কার্ড, ফুয়েল কার্ড (ফুয়েল পাস), ক্যাপ্টেনস কার্ডও চালু করেছে সরকার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্মসূচির প্রাথমিক ধাপে দেশের ১৩টি জেলার সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন থেকে ৩৭ হাজার ৫৬৪টির বেশি নারী-প্রধান পরিবার এই কার্ড সুবিধা পেয়েছে। আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ২ কোটি পরিবারের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। পর্যায়ক্রমে সব নগদ ভাতা এবং টিসিবির সহায়তা একটিমাত্র কার্ডের অধীনে নিয়ে আসা হবে। প্রতিটি পরিবারকে আড়াই হাজার করে টাকা প্রদানের কথাও উল্লেখ রয়েছে নীতিমালায়।

চট্টগ্রামে ফ্যামিলি কার্ডের সুফল

চট্টগ্রামে সরকারের ফ্যামিলি কার্ডের সুফল পাচ্ছে ৫ হাজার ৫৭৫ পরিবার। নগরের ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হয় চলতি বছরের ১০ মার্চ থেকে। ওই দিন প্রকল্পটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এখনও নগরের মধ্যে এই একটি ওয়ার্ডেই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম সীমাবদ্ধ।

এদিকে ১৫টি উপজেলার মধ্যে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর গুমান মর্দন ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের জন্য জরিপ কার্যক্রম ও ডাটা এন্ট্রি শেষ হয়েছে। শিগগিরই এই ওয়ার্ডে ৫০০ থেকে ৬০০ পরিবারকে এ কার্ড দেওয়া হবে।

এ তথ্য নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. জসীম উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমান সরকারের নেওয়া ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পে নগরের ৪১ নম্বর দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডে ৫ হাজার ৬০০ পরিবার মার্চ মাস থেকে আড়াই হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। জেলার মধ্যে হাটহাজারী উপজেলার গুমনমর্দন ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্পের আওতায় জরিপ ও ডাটা এন্ট্রি কার্যক্রম শেষ হয়েছে। শিগগিরই ৫০০ থেকে ৬০০ জন পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে।’

নগরের ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান, গত মার্চ মাস থেকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আড়াই হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। এতে বেশ উপকার হচ্ছে তার। এটি সরকারের ভালো উদ্যোগ।

ময়মনসিংহে ৭৩০ জন পাচ্ছেন সুবিধা

ময়মনসিংহ জেলায় এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র নান্দাইল উপজেলায় একটি মাত্র ইউনিয়নে ৭৩০ জন উপকারভোগীর মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের উপপরিচালক রাজু আহমেদ। তিনি জানান, গত ১৬ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সারা দেশের মতো নান্দাইল উপজেলায় বেতাগৈর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের চরভেলামারী গ্রামের ৭৩০টি পরিবারের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। সেই থেকে উপকারভোগীরা মোবাইলের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সুবিধা পাচ্ছেন। প্রতি মাসে এই সুবিধা তারা পাবেন।

চরভেলামারী গ্রামের ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া সুবিধাভোগী সমিরন বেগম বলেন, ‘উদ্বোধনের দিনই আমাদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি মোবাইলে ২ হাজার ৫০০ টাকা পেয়েছি। প্রতি মাসে এই সুবিধা পাবো। এই টাকা দিয়ে আমি সংসার চালাতে পারছি।’

সুবিধাভোগী পরিবারের সদস্য শামসুল আলম বলেন, ‘সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অসহায় গরিব মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করেছেন। এই উদ্যোগটা আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য ভালো একটি ব্যবস্থা। প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে মোবাইলের মাধ্যমে চলে আসবে। এই টাকা দিয়ে বাজার করে পুরো মাস মোটামুটি সংসার চালিয়ে নেওয়া যায়।’

রংপুরে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হয়নি

রংপুর জেলার কোথাও ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়নি। সারা দেশের বেশ কিছু উপজেলায় এ কার্যক্রম শুরু হলেও সেই তালিকায় রংপুরের কোনও উপজেলার নাম নেই। ফলে আপাতত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হচ্ছে না। রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই ফ্যামিলি কার্ডের কার্যক্রম শুরু হবে জেলায়। তবে টিসিবি কার্ড দিয়ে ন্যায্যমূল্যে পণ্য পাচ্ছেন উপকারভোগীরা।

কুমিল্লায় কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ড

কুমিল্লায় কৃষক কার্ড পেয়েছেন ১৪৫৮ জন, ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন ৫৮৭ জন। বিবির বাজার এলাকার কৃষক মোবারক হোসেন বলেন, ‘অতীতে অনেক সময় টাকার অভাবে সময়মতো ওষুধ ও সার কিনতে পারতাম না। এখন বিষয়টা ভিন্ন। আমি পরশুদিনও জমির সার নিয়ে এসেছি কার্ড দিয়ে। এখন টাকা থাকুক বা না থাকুক কার্ড দিয়ে সার আর ওষুধ আনা যায়।’

রাজশাহীতে ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছে ৬৬৯ পরিবার

রাজশাহীর পবা উপজেলায় ৬৬৯টি পরিবারের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। ১৬ মে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের তিনটি গ্রাম-বেড়পাড়া, দবিরমোল্লা পাড়া ও দরগা পাড়ায় এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। রাজশাহী প্রান্তে বায়া শিশু পরিবার মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতীকীভাবে ১০ জন উপকারভোগীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়া হয়।

পবা উপজেলার বেড়পাড়া এলাকার বিলকিস বানু বলেন, ‘এই কার্ড আমাদের জন্য অনেক বড় সহায়তা। আগে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো, এখন নিয়মিত ভাতা পেলে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবো।’ একই এলাকার ফিরোজা বেগম বলেন, ‘মোবাইলে টাকা আসার খবর পেয়ে খুব ভালো লেগেছে। এখন আর ধারদেনার ওপর নির্ভর করতে হবে না। এতে আমাদের জীবনযাত্রা কিছুটা সহজ হবে।’ পবা উপজেলার দরগা পাড়ার রহিমা খাতুন বলেন, ‘এভাবে সরাসরি মোবাইলে টাকা পাওয়াটা আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। এতে আমাদের আস্থা বেড়েছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করছি।’

সিলেটে ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন ৪৪৪ জন

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার নিজপাট ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ৪৪৪ জন ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছেন। এ ছাড়া সিলেট জেলায় ৭১ হাজার প্রতিবন্ধী কার্ড, ১ লাখ ৫২ হাজার বয়স্ক ভাতা, ৫২ হাজার প্রতিবন্ধী ভাতা ও ১ হাজার ৬০০ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলা সমাজসেবা অফিসার আব্দুর রফিক।

বরিশালে পেলো ৬১১ পরিবার

বরিশাল জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক এ কে এম আখতারুজ্জামান তালুকদার জানিয়েছেন, বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে ৬১১ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জেলার হিজলা উপজেলার বড়জালিয়া গ্রামে ১ নম্বর ওয়ার্ডে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে জরিপ কাজ চলমান রয়েছে। সেখানেও কার্ড দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

বরিশালের টিসিবির কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, বর্তমানে সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭১ হাজার ৩০টি পরিবার এবং জেলার ১০ উপজেলায় এক লাখ ৮২ হাজার ৩৮টি পরিবার স্মার্ট কার্ডের আওতায় টিসিবির পণ্য ক্রয় করছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে সিটি করপোরেশনে ৯০ হাজার কার্ড থাকলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে ৫৮ হাজার ৪২৬টি বাতিল করা হয়। ১০ উপজেলায় কার্ড ছিল এক লাখ ২৯ হাজার। সেখান থেকে বাদ করা হয় ২২ হাজার কার্ড। বাকিরা কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন।