পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষে সাফল্য, দৃষ্টিনন্দন বাগান দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে
পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিক আঙুর চাষে সাফল্য, দৃষ্টিনন্দন বাগান

পঞ্চগড়ে এবার বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষে সাফল্য এসেছে। জেলার তালমা গ্রামের কয়েকটি বাগানে সবুজ পাতার ফাঁকে থোকা থোকা আঙুর ঝুলে থাকার দৃশ্য এখন সবার নজর কাড়ছে। এই আঙুর বাগানগুলো বিদেশি কোনো বাগানের চেয়ে কম নয়, বরং দেশের সর্বউত্তরের এই জেলার কৃষি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

আঙুর চাষে নতুন সম্ভাবনা

সুস্বাদু ফল আঙুর খেতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু বিদেশ থেকে আমদানিকৃত আঙুরের দাম চড়া হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে। পঞ্চগড়ে আঙুর উৎপাদনের সফলতা সেই বাস্তবতা বদলে দিতে পারে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার তালমা গ্রামের কৃষকরা এখন নিজেদের জমিতে আঙুর ফলিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।

দর্শনার্থীদের ভিড়

আঙুর বাগানের বিস্ময়কর দৃশ্য উপভোগ করতে বিভিন্ন স্থান থেকে অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসছেন। কেউ কেউ বাগানে ছবিও তুলছেন। আঙুর উৎপাদনের এই সাফল্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন সবাই। দেশের সর্ব উত্তরের জনপদ পঞ্চগড় সমতলের চা উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থান দখল করার পর এবার আঙুর চাষে সফলতা যেন ধরা দিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষকদের উদ্যোগ

পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের তালমা এলাকার প্রধানপাড়া গ্রামের মনিরুজ্জামান সুমন শখের বসে শুরুতে অল্প কিছু আঙুর গাছ রোপণ করেছিলেন। পরে তিনি দেখতে পান এই এলাকার মাটি ও আবহাওয়া আঙুর চাষের জন্য উপযোগী। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এখন বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ শুরু করেছেন তিনি। প্রায় ৫০ শতক জমিতে বাণিজ্যিকভাবে লাগানো গাছগুলোর বয়স মাত্র ১১ মাস হলেও ইতোমধ্যে ভালো ফলন এসেছে। বাজারে আঙুরের চাহিদা বেশি থাকায় লাভের সম্ভাবনাও অনেক ভালো বলে আশা করছেন সুমন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাগানের কেয়ারটেকার মো. মিরাজ ইসলাম বলেন, 'আমাদের বাগান এখনো নতুন। এখানে তিনটি জাতের প্রায় ৪০০ আঙুর গাছ রয়েছে। আমরা আশাবাদী, আগামী বছর আরও বেশি ও ভালো ফলন পাব। আমাদের উৎপাদিত আঙুরগুলো বেশ মিষ্টি ও সুস্বাদু। বাগানে যারা ঘুরতে আসছেন, তাদেরও আঙুর খাইয়ে দেখাচ্ছি। সবাই এর স্বাদ ও মানের প্রশংসা করছেন। এতে আমরা আরও উৎসাহ পাচ্ছি। আমরা এখান থেকে চারা উৎপাদন করে বিক্রি করছি।'

আরেক কৃষক আব্দুর রফিক বলেন, 'আগে ভাবতাম আঙুর শুধু বিদেশেই হয়। এখন নিজের জমিতে আঙুর ফলাতে পেরে খুব ভালো লাগছে। স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত পরামর্শ পাচ্ছি। যদি সরকারি সহযোগিতা বাড়ে তাহলে আরও বড় পরিসরে চাষ করা সম্ভব হবে।'

ছাদে আঙুর চাষ

নিজ বাড়ির ছাদে আঙুর চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কলেজছাত্র ও কৃষি উদ্যোক্তা আল ফারুক সবুজ। পঞ্চগড় পৌর এলাকার রাজনগর মহল্লার এই তরুণ উদ্যোক্তা তার প্রতিবেশী চাচা মতিয়ার রহমানের তিনতলার বাড়ির ছাদে ১৮-২০ জাতের ৩৬টি চারা রোপণ করেছেন। প্রশিক্ষণ বা পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ইন্টারনেটের সহায়তা নিয়ে গড়ে তুলেছেন এই ব্যতিক্রমী বাগান।

সবুজ জানান, 'প্রথমে আমি নিজ বাড়িতে একটি আঙুরের চারা রোপণ করি; কিন্তু গাছে প্রচুর ফল আসার পর দেখি আঙুর টক। পরে এ নিয়ে ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটির পর বাগান আকারে আঙুর চাষ করার পরিকল্পনা করি। কিন্তু আমার তো জমি নাই। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেশী চাচার সঙ্গে কথা বললে তিনি তার ছাদে বাগান করার অনুমতি দেন। প্রথমবারেই সাফল্য পাই। আমার স্বপ্ন এই অর্গানিক আঙুর জেলাজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া।'

কৃষি বিভাগের সহায়তা

পঞ্চগড় সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আসাদুন্নবী বলেন, 'পঞ্চগড়ের আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণ বিদেশি বিভিন্ন ফল চাষের জন্য বেশ উপযোগী। আঙুর চাষ নিয়েও আমরা কৃষকদের নিয়মিত উৎসাহিত করছি। আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে এ জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজন কৃষক সফলতার মুখ দেখেছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।'

আঙুর বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থী আব্দুর রহমান বলেন, 'পঞ্চগড়ে এভাবে আঙুর চাষ হবে কখনো কল্পনাও করিনি। বাগানে এসে খুব ভালো লাগছে। অনেকেই ছবি তুলছেন, পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন। এটা পর্যটনের মতো আকর্ষণও তৈরি করেছে। স্থানীয়ভাবে আঙুর উৎপাদন হলে মানুষ বিষমুক্ত ফল খেতে পারবে।'

পঞ্চগড়ের এই আঙুর চাষের সাফল্য কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের উদ্যোগ ও কৃষি বিভাগের পরামর্শে বিদেশি জাতের আঙুর চাষে ইতোমধ্যে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন উদ্যোক্তারা।