বাংলাদেশের তরুণদের চাকরি সংকট: বিশ্বব্যাংকের উদ্বেগজনক তথ্য
বিশ্বব্যাংকের একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বাংলাদেশের চাকরির বাজারে প্রবেশ করা প্রায় অর্ধেক তরুণই এখনো কোনো চাকরি খুঁজে পায়নি। এই তথ্য বাংলাদেশের যুব সমাজের কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার পরিসংখ্যানের সাথে পার্থক্য
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১৪%। এটি দেশের সামগ্রিক বেকারত্বের হারের প্রায় দ্বিগুণ। তবে বিশ্বব্যাংকের এই নতুন তথ্য আইএলও-এর পরিসংখ্যানের সাথে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই দুটি সংখ্যার মধ্যে কোনটি সঠিক?
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বৃহৎ ও জটিল অর্থনীতির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নির্ভুল পরিসংখ্যান তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। টিম ওয়ার্স্টল, লন্ডনের অ্যাডাম স্মিথ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো, তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন, "১৫ কোটি মানুষের সমাজের জন্য ১৩.২৭% এর মতো সুনির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়া আসলে হাস্যকর। আমরা যদি সংখ্যার প্রথম অঙ্কটি সঠিকভাবে পাই, সেটাই বড় সাফল্য।"
দুটি ভিন্ন সংজ্ঞা, দুটি ভিন্ন ফলাফল
এই বৈপরীত্যের মূল কারণ হলো দুটি সংস্থা চাকরির ভিন্ন ভিন্ন সংজ্ঞা ব্যবহার করছে। বিশ্বব্যাংক ফর্মাল চাকরির কথা বলছে - যেখানে চুক্তি, আইনি সুরক্ষা, ন্যূনতম মজুরি এবং অন্যান্য সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে, আইএলও পরিমাপ করছে কাজ করা এবং বেতন পাওয়া মানুষদের সংখ্যা।
ওয়ার্স্টল ব্যাখ্যা করেন, "আমরা সবাই এমন মানুষ চিনি যারা ফর্মাল চাকরিতে খুব বেশি পরিশ্রম করে না, আবার এমন মানুষও চিনি যারা চাকরি না হলেও অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে।" এই পার্থক্যটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
ফর্মাল চাকরির ব্যয় ও যুব বেকারত্ব
বিশ্লেষকদের মতে, ফর্মাল চাকরির উপর আরোপিত ব্যয় - যেমন ন্যূনতম মজুরি, ছুটির সুবিধা, চাকরি চলে যাওয়ার সুরক্ষা - অনেক ক্ষেত্রে খুব বেশি হয়ে যায়। এই উচ্চ ব্যইর কারণে অনেক ইনফর্মাল কাজ ফর্মাল চাকরিতে রূপান্তরিত হতে পারে না।
ইউরোপীয় শ্রম বাজারের উদাহরণ টেনে ওয়ার্স্টল বলেন, "লাতিন দেশগুলোতে (ইতালি, স্পেন) ফর্মাল চাকরির জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা ও উচ্চ ব্যয় রয়েছে। অন্যদিকে নর্ডিক দেশগুলোতে (নরওয়ে, সুইডেন) ফর্মাল সুরক্ষা কম কিন্তু পুনরায় প্রশিক্ষণের জন্য চমৎকার কল্যাণ ব্যবস্থা রয়েছে। লাতিন পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণরা।"
ইউরোপের অভিজ্ঞতালাতিন দেশগুলোতে যুব বেকারত্বের হার নর্ডিক দেশগুলোর তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি। ব্রিটেনের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকেও এই প্রবণতা দেখা যায়। তরুণদের জন্য মজুরি ও সুরক্ষা বাড়ানোর সাথে সাথে তাদের নিয়োগের উপর কর বাড়ানো হলে যুব বেকারত্ব বেড়েছে। পরে সরকার তরুণ নিয়োগের জন্য কর ভর্তুকি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
চাহিদা ও যোগানের নীতি
অর্থনীতির মৌলিক নীতি অনুযায়ী, ফর্মাল নিয়োগের ব্যয় বাড়লে তার চাহিদা কমে। ওয়ার্স্টল স্পষ্ট করেন, "যদি আপনি চান যে নিয়োগকর্তারা আরও ফর্মাল শ্রম চাহিদা তৈরি করুক, তাহলে আপনাকে সেই ফর্মাল শ্রমকে সস্তা করতে হবে। এর অর্থ অগত্যা মজুরি কমানো নয়, বেতন-বহির্ভূত অন্যান্য ব্যয় কমানোও কার্যকর হতে পারে।"
তিনি জোর দিয়ে বলেন, "অর্থনীতি এখানে কোনো প্রস্তাব দেয় না, শুধু বর্ণনা করে। যদি বেশি তরুণ ফর্মাল চাকরি পেতে হয়, তাহলে নিয়োগকর্তার জন্য ফর্মাল ও ইনফর্মাল চাকরির মূল্যের পার্থক্য কমাতে হবে। এই মহাবিশ্ব এভাবেই কাজ করে।"
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি জটিল চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংক ও আইএলও-এর পরিসংখ্যানের এই পার্থক্য সরকারি নীতি নির্ধারক, অর্থনীতিবিদ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে এবং ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে তরুণদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।



