ইরানের তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: বড় সুবিধাভোগী হতে পারে ভারত
ইরানের তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: বড় সুবিধাভোগী ভারত

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল শিল্পের ওপর ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে, যা থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক ভারত ব্যাপকভাবে সুবিধা পেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ২১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর একটি অস্থায়ী সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে, যা ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও পেট্রোকেমিক্যালসের লেনদেন, জাহাজ পরিবহণ, বীমা ও ব্যাংকিং সেবা অনুমোদন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের পটভূমি

ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা, সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরিদর্শন পুনরায় চালুর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) পুনরায় পরিদর্শনের সুযোগ দিতে এবং বিস্তৃত কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতে সম্মত হওয়ার পরই এই ছাড় ঘোষণা করা হয়। ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক তেলবাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করে, কারণ বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ভারতের জন্য সুবিধা

ভারত তার মোট তেল চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা সরাসরি দেশটির আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। গত কয়েক বছরে ভারত তার তেল আমদানির উৎসে বড় পরিবর্তন এনেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ভারত ছাড়মূল্যের রুশ তেলের অন্যতম বড় ক্রেতায় পরিণত হয়। বর্তমানে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ থেকে ৪০ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে। অন্যদিকে সৌদি আরব, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও ভারতের নির্ভরতা রয়েছে। ২০২৫ সালে ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় অর্ধেকই এসেছে ওপেকভুক্ত দেশগুলো থেকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এ অবস্থায় ইরানের তেল আবার বাজারে ফিরলে ভারতের জন্য সরবরাহের একটি নতুন বিকল্প তৈরি হবে। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে ইরান ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশ। প্রতিযোগিতামূলক দাম, সহজ ঋণ সুবিধা এবং কম পরিবহণ ব্যয়ের কারণে ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো ইরানি তেলকে গুরুত্ব দিত। বর্তমান ছাড়ের ফলে ভারতীয় পরিশোধনাগার ও ইরানি সরবরাহকারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তাৎক্ষণিক প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা

তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিসরে ইরানি তেল আমদানি সম্ভব নয়, কারণ ছাড়ের মেয়াদ মাত্র ৬০ দিন এবং এটি কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভরশীল। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়লে দাম কমার সম্ভাবনা থাকে। ফলে ভারত সরাসরি ইরানি তেল বেশি না কিনলেও বৈশ্বিক দামের পতন থেকে লাভবান হতে পারে। ভারতের বার্ষিক তেল আমদানি ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে সামান্য পতনও দেশটির জন্য বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব

ভারতের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি। এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে ভারতের বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি হয়। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফনের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা ভারতের জন্য জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা বাড়াবে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরানের তেল আবার বড় পরিসরে বাজারে ফিরতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমে আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চাপে থাকতে পারে। এর ফলে ভারতের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আমদানি ব্যয় কমানো এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য উন্নত করার প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী হবে। সূত্র: এনডিটিভি