বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ২৮ এপ্রিল জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং শুরুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হবে।
প্রস্তুতি ও তারিখ নির্ধারণ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সকালে ইত্তেফাক ডিজিটালকে জানান, সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং অনুষ্ঠানের তারিখ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এটি কমিশনিংয়ের পূর্ববর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
এ সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আযাদ, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধি এবং রুশ সরকারের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বলে সচিব জানিয়েছেন।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময়সীমা
তিনি আরও জানান, প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ জুলাইয়ের শেষ বা আগস্টের শুরুতে প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে এবং ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছানো হবে।
লাইসেন্স ও জনবল অনুমোদন
গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মঈনুল ইসলামের নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং লাইসেন্স এবং সংশ্লিষ্ট ৫২ জনের জনবল অনুমোদন হস্তান্তর করেন। এর আগে লাইসেন্স না পাওয়ায় গত ৭ এপ্রিল নির্ধারিত জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান ইত্তেফাক ডিজিটালকে বলেন, গত ৭ এপ্রিল উদ্বোধনের জন্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিলেও কিছু ক্রিটিক্যাল ইস্যু সামনে আসে। সেগুলো সমাধানের জন্য সময় দেওয়া হয়। এখন পজিশন ভালো। সেজন্য প্রথম ইউনিটে ফুয়েল লোডিংয়ের (কমিশনিং) বিষয়ে এখন সবাই একমত হওয়ায় ১৬ এপ্রিল লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।
লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞরা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান বলেন, কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ৫২ জন বিশেষজ্ঞ সফলভাবে লাইসেন্স অর্জন করেছেন। লিখিত, মৌখিক (ভাইভা) এবং সিমুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমে তারা এই লাইসেন্স পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব পরীক্ষা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অনুষ্ঠিত হয়। এই পরীক্ষাগুলো পরিচালনা করেছে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থা রোস্টেকনাডজর, রাশিয়ার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রযুক্তিগত প্রতিষ্ঠান ভিও-সেফটি, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)-এর বিশেষজ্ঞরা।
এই ৫২ জন লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ এবং রাশিয়ার লাইসেন্সধারী অপারেটরদের সমন্বয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালিত হবে। তিনি আরও জানান, জ্বালানি লোডিংয়ের পর বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা চালিয়ে ফাইনাল সেফটি অ্যানালাইসিস রিপোর্ট প্রস্তুত করা হবে। কমিশনিং ধাপটি অত্যন্ত কঠোর ও চ্যালেঞ্জিং পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করতে হবে। সব প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হলে তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে, যা ধীরে ধীরে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছাবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ১০ থেকে ১১ মাস সময় লাগবে।
যৌথ সক্ষমতা প্রদর্শন
ড. জায়েদুল হাসান আরও বলেন, জ্বালানি লোডিংয়ের প্রস্তুতি হিসেবে যে পরীক্ষাগুলো নেওয়া হয়েছে, তাতে এনপিসিবিএল-এর অপারেটররা রাশিয়ার অপারেটরদের সঙ্গে যৌথভাবে সফলভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছেন। এই সাফল্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপদ ও দক্ষ পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি যুগান্তকারী প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রটি চালু হলে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট কমাতে সাহায্য করবে এবং ব্যয়বহুল আমদানিকৃত তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করবে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা
এদিকে ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পে স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা জোরদার এবং স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি ও সরাসরি মতবিনিময়ের লক্ষ্যে প্রকল্প সাইটের নিকটবর্তী চরসাহাপুরে ২৩ এপ্রিল 'উঠান বৈঠক' আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে স্থানীয় জনগণ অংশগ্রহণ করেন।
বৈঠকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের নিরাপত্তা, পরিবেশগত প্রভাব, প্রযুক্তিগত দিক ও আর্থ-সামাজিক গুরুত্ব সম্পর্কে সহজ ভাষায় তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এসময় প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন বলেন, স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা একটি বড় জাতীয় প্রকল্পের সফলতার মূল চাবিকাঠি। তিনি গুজব বা যাচাই বিহীন তথ্য থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে সঠিক তথ্যের জন্য প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, তথ্যকেন্দ্র ও অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ 'Nuclear Power in Bangladesh' অনুসরণের পরামর্শ দেন।
প্রকল্পের বিবরণ
প্রসঙ্গত, পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটি মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, যা দেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি পূরণ করবে।



