মানুষের বয়স যত বাড়ে, মৃত্যুর সময় তত ঘনিয়ে আসে; সাধারণভাবে আমরা এমনটাই ভাবি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যালয়ের ২০২৫ সালের একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ বলছে একেবারেই উল্টো কথা! বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের বয়স যত বাড়ে, তার গড় আয়ুর সঙ্গে নতুন করে আরও কয়েক বছর যোগ হতে থাকে। অর্থাৎ, যত দিন বাঁচবেন, আপনার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ততটাই বেড়ে যাবে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সম্ভাব্য গড় আয়ু কেবল একটি সাধারণ সংখ্যা নয়, এর পেছনে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি, উন্নত পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিধির অবদান। ১৮০০ সালের শুরুর দিকে যখন বিশ্বের জনসংখ্যা মাত্র ১০০ কোটি ছিল, তখন মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ২৯ বছর। সেখান থেকে আজ বিশ্ব অনেক দূর এগিয়েছে। রোগ ব্যবস্থাপনার নিত্যনতুন উন্নতি ভবিষ্যতে মানুষের এই জীবনকালকে আরও দীর্ঘ করবে বলে আশাবাদ গবেষকদের।
পরিসংখ্যান কী বলছে?
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মলগ্নে একজন পুরুষের গড় আয়ু নির্ধারণ করা হয় ৭৪ বছর এবং নারীর ক্ষেত্রে তা ৮০ বছর। কিন্তু কোনও মার্কিন পুরুষ যদি বেঁচে থেকে ঠিক ৭৪ বছর বয়স পার করে ফেলেন, তবে তিনি আরও বেশি দিন বাঁচবেন। উদাহরণস্বরূপ, ৭৫ বছর বয়সী একজন মার্কিন পুরুষের গড় আয়ু বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬ বছর। অর্থাৎ, স্রেফ বেঁচে থাকার কারণেই তার সম্ভাব্য আয়ুর সঙ্গে আরও ১২ বছর যুক্ত হয়ে গেলো!
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এভাবে সম্ভাব্য আয়ু বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে বিজ্ঞানীরা বলছেন 'সারভাইভার বায়েস'। সহজ কথায়, একজন মানুষ যে জীবনযাপনের অভ্যাসের কারণে এত দিন টিকে আছেন, সেই একই ভালো অভ্যাসগুলো তাকে ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘকাল বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। অবশ্য যুদ্ধ বা মহামারির মতো আকস্মিক স্বাস্থ্য সংকট এই হিসাবকে ওলটপালট করে দেয়। যেমন, ২০১৯ সালে মার্কিন পুরুষদের গড় আয়ু ৭৬ বছর হলেও, কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কায় ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশটিতে মৃত্যুর হার ১৭ শতাংশ বেড়ে যায়, যার ফলে গড় আয়ু দুই বছর কমে গিয়েছিল।
তবে মহামারি বা যুদ্ধ না থাকলে, নির্ধারিত গড় আয়ুর কাছাকাছি পৌঁছানো মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা পরিসংখ্যানগতভাবে বেশ কমে যায়। ৭৪ বছর বয়সী একজন মার্কিন পুরুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা মাত্র ০.০০৬০৬৪ এবং ৮০ বছর বয়সী একজন নারীর ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা ০.০০৫১১৯। যার অর্থ, এই বয়সে পৌঁছানো ব্যক্তিরা দ্রুত মারা যাওয়ার চেয়ে আরও বেশি দিন বেঁচে থাকার পথেই এগিয়ে যান। লক্ষণীয় বিষয় হলো, একজন মার্কিন পুরুষের বয়স যখন ৫৪ বছর হয়, তখন তার সম্ভাব্য আয়ু আরও এক বছর বাড়ে। আর নারীদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনটি ঘটে ৪৭ বছর বয়সে।
জন্মের পর আয়ুর পরিবর্তন
পরিসংখ্যানের আরেকটি অদ্ভুত দিক হলো, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাব্য আয়ু থাকে তার জন্মের ঠিক পর মুহূর্তটিতে। জন্মলগ্নে একটি ছেলে শিশুর সম্ভাব্য আয়ু থাকে ১২০.৪৮ বছর এবং মেয়ে শিশুর ক্ষেত্রে তা ১২০.৬২ বছর। শৈশবে ছেলে ও মেয়েদের গড় আয়ুর এই ব্যবধান থাকে সবচেয়ে কম।
তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমতে থাকে।
- ১ বছর বয়সে: আয়ু এক ধাক্কায় প্রায় ৯ বছর কমে যায়। তখন মেয়েদের সম্ভাব্য আয়ু হয় ১১১.১৬ বছর এবং ছেলেদের ১১১.০২ বছর।
- ২ বছর বয়সে: জন্মলগ্নের চেয়ে আয়ু কমে যায় প্রায় ২০ বছর। মেয়েদের ক্ষেত্রে তা দাঁড়ায় ১০১.৩৭ এবং ছেলেদের ১০১.০৪ বছরে।
- ১০ বছর বয়সে: এবার ছেলে ও মেয়েদের গড় আয়ুর মধ্যে বড় ব্যবধান স্পষ্ট হতে শুরু করে। ১০ বছর বয়সে ছেলেদের সম্ভাব্য আয়ু কমে হয় ৮৫.৪৬ বছর এবং মেয়েদের হয় ৮৮.৩১ বছর (ব্যবধান ৩ বছর)।
- ১৩ বছর বয়সে: কিশোর বয়সে পা দিয়ে ছেলেদের সম্ভাব্য আয়ু হয় ৮৩.৫৯ বছর এবং মেয়েদের ৮৬.৬৪ বছর।
- ১৮ বছর বয়সে: প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর একজন পুরুষের সম্ভাব্য আয়ু দাঁড়ায় ৮১.৩২ বছর এবং নারীর ৮৫.১০ বছর (ব্যবধান ৪ বছর)।
- ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সে: ১৯ বছর বয়সে ছেলেদের আয়ু কমে ৮১.০৩ এবং মেয়েদের ৮৪.৬৬ বছর হয়। ২৫ বছর বয়সে তা আরও কমে যথাক্রমে ৭৯.০৬ ও ৮৩.৩২ বছরে নেমে আসে।
মানুষের বয়স ৩০, ৩৫ বা ৪০ বছরে পৌঁছানোর পর নারী ও পুরুষের এই সম্ভাব্য আয়ুর ব্যবধান ভগ্নাংশের অঙ্কে কমতে শুরু করে। যেমন ৩০ বছর বয়সে পুরুষের সম্ভাব্য আয়ু থাকে ৭৮.০১ বছর এবং নারীর ৮২.৪৭ বছর। ৩৫ বছরে তা দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭৭.২১ ও ৮১.৮৫ বছরে এবং ৪০ বছর বয়সে পুরুষের আয়ু হয় ৭৬.৫ বছর ও নারীর ৮১.৪৫ বছর।
তবে ঐতিহাসিকভাবেই নারীরা পুরুষদের চেয়ে বেশি দিন বাঁচেন এবং বর্তমান সময়েও এই নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম হয়নি। এর পেছনে জীবনযাত্রার ধরন, ঝুঁকির মাত্রা এবং জৈবিক কারণগুলো জড়িত।



