হরমুজ প্রণালির সংকটে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য সংকটের আশঙ্কা
হরমুজ প্রণালির সংকটে দক্ষিণ এশিয়ায় খাদ্য সংকটের আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালিতে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার বিষয়টিকে আপাতদৃষ্টিতে কেবল জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা মনে হতে পারে। তবে এর ভেতরের প্রভাব, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য অনেক বেশি গভীর ও উদ্বেগজনক। জ্বালানি সরবরাহের এই সংকট কেবল জ্বালানির দামই বাড়াচ্ছে না, বরং এটি সার সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ভঙ্গুর কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থার কারণে সামনে একটি বড় ধরনের খাদ্য সংকটের স্পষ্ট পূর্বাভাস দিচ্ছে।

জ্বালানি ও কৃষি ব্যবস্থার আন্তঃসম্পর্ক

আধুনিক কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থা মূলত জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এটি কেবল পরিবহন বা সেচের জন্যই নয়, বরং সার উৎপাদনের জন্যও জরুরি। বিশেষ করে নাইট্রোজেন জাতীয় সার উৎপাদনের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাস অপরিহার্য। ফলে জ্বালানি সরবরাহ সংকুচিত হলে সারের উৎপাদন কমে যায় এবং দাম বেড়ে যায়। জ্বালানি খাতের এই ধাক্কা খুব দ্রুত কৃষি ব্যবস্থায় প্রবেশ করে।

দক্ষিণ এশিয়ার নির্ভরশীলতা

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সার এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালে ভারত তার মোট আমদানিকৃত সারের অর্ধেকেরও বেশি এনেছে এই পারস্য উপসাগর থেকে। এই আমদানিকৃত সার দীর্ঘ পথ এবং সীমান্ত পেরিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছায়। ফলে জ্বালানির চড়া দাম এবং লজিস্টিক বা পরিবহন ব্যবস্থার বিঘ্ন সারের সরবরাহকে আরও বিলম্বিত ও সীমিত করে তুলছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সার আমদানির ওপর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নির্ভরশীলতার চিত্রটি বিশাল। এই অঞ্চলে ভারত বছরে প্রায় ৬০ মিলিয়ন (৬ কোটি) টন, পাকিস্তান প্রায় ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) টন এবং বাংলাদেশ প্রায় ৬ মিলিয়ন (৬০ লাখ) টন সার পুষ্টি ব্যবহার করে। অন্যদিকে নেপালের মতো দেশগুলোর নিজস্ব উৎপাদন ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় তাদের ঝুঁকি আরও এক ধাপ বেশি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষির সময় সংবেদনশীলতা

কৃষি অত্যন্ত সময় সংবেদনশীল একটি খাত। ফসল নির্দিষ্ট বৃদ্ধির ধাপে পুষ্টি উপাদান না পেলে কৃষকেরা আর হারানো উৎপাদনশীলতা ফিরে পান না। বর্তমানে বৈশ্বিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব সার বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (তিন ভাগের এক ভাগ) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা তীব্র সংকট ও উচ্চ মূল্যের সৃষ্টি করছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নাইট্রোজেন ব্যবহার না করলে গমের ফলন অর্ধেকেরও বেশি কমে যেতে পারে। অন্যদিকে অপর্যাপ্ত ফসফরাসের কারণে ধানের ফলন কমতে পারে প্রায় ৩০ শতাংশ। সারের ব্যবহার কম হলে বিশ্বব্যাপী উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়, যা একটি স্থিতিশীল খাদ্য ব্যবস্থাকে দ্রুত ঘাটতির দিকে ঠেলে দেয়। ফলন কমে গেলে দাম বেড়ে যায়, যা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে সংকুচিত করে। নেপালের মতো দেশে, যেখানে আয়ের একটি বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় হয়, সেখানে সামান্য মূল্যবৃদ্ধি মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

পূর্ববর্তী সংকটের শিক্ষা

এই ধরনের পরিস্থিতি এবারই প্রথম নয়। ২০০৭-২০০৮ সালের বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের সময়ও তেলের দাম বাড়ার কারণে সারের খরচ তীব্রভাবে বেড়েছিল। সে সময় সারের দাম প্রায় তিন গুণ এবং বিশ্বব্যাপী খাদ্যের দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্য মূল্য সূচক বেড়েছিল প্রায় ৫৭ শতাংশ।

সে সময় এর প্রভাব দেশভেদে ভিন্ন ছিল। বাংলাদেশে ধানের দাম ৬০ শতাংশেরও বেশি এবং কিছু ক্ষেত্রে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। বিপরীতে ভারতে শক্তিশালী নীতিগত হস্তক্ষেপ ও রফতানি নিষেধাজ্ঞার কারণে অভ্যন্তরীণ শস্যের দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল, যা প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মতো বেড়েছিল। সামগ্রিকভাবে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রধান খাদ্যের দাম বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং ১০ কোটিরও বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছিল। তখনকার সংকট প্রমাণ করেছিল যে জ্বালানির ধাক্কা কত দ্রুত খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রূপ নিতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতির সতর্কবার্তা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিচ্ছে। জ্বালানি, পানি ও খাদ্য ব্যবস্থা একে অপরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে জড়িত। তাই নীতিগতভাবে জ্বালানি সংকটকে আর কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

করণীয়

তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে সারের সরবরাহ স্থিতিশীল করা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত মজুত বা বাফার স্টক গড়ে তোলা, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা। দীর্ঘমেয়াদে দক্ষিণ এশিয়াকে ইউরিয়ার মতো মূল সারগুলোর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা দূর করতে স্টোরেজ বা গুদামজাতকরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে।

ঝুঁকিগুলো ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। যদি বর্তমান সরবরাহ সংকট চলতেই থাকে, তবে দক্ষিণ এশিয়ার পরবর্তী সংকটটি কেবল জ্বালানি সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা রূপ নেবে খাদ্য সংকটে। জ্বালানির ধাক্কা কেবল জ্বালানি খাতের মধ্যে থাকে না; তা দ্রুত খাদ্য ব্যবস্থায় পৌঁছে যায় এবং সেখানে আঘাত হানলে তার পরিণতি সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

দ্য ডিপ্লোম্যাট অবলম্বনে।