বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের চলমান অস্থিরতার মধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুসংহত করতে এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি অব্যাহত রাখতে অতিরিক্ত ৩৫ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। সোমবার (১৮ মে) সংস্থাটির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
অর্থায়নের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট
গত ১৫ মে ‘এনার্জি সেক্টর সিকিউরিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় এই অর্থায়ন অনুমোদিত হয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে এলএনজি আমদানির মূল্য পরিশোধে সহায়তা করা হবে। বাংলাদেশ বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল রাখা এবং সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদা পূরণে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্য অস্থিরতা ও সরবরাহ ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত জ্বালানি ও সার সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর।
অর্থায়নের সুবিধা ও কাঠামো
বিশ্বব্যাংকের মতে, নতুন এই অর্থায়ন সাশ্রয়ী পদ্ধতিতে এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে পেট্রোবাংলার আমদানি বিল পরিশোধ সক্ষমতাও বাড়াবে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহ করতে পারবে, যা স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস কেনার নির্ভরতা কমাবে। এতে তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, স্থিতিশীল ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই অর্থায়ন প্যাকেজের আওতায় ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ)-সমর্থিত একটি পেমেন্ট গ্যারান্টি সুবিধা দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) এবং স্বল্পমেয়াদি ক্রেডিট লাইনের সহায়তায় এলএনজি আমদানির অর্থ পরিশোধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, এই আর্থিক ব্যবস্থাগুলো বাংলাদেশকে বাজারের যেকোনও অস্থিরতা মোকাবিলায় নমনীয়তা দেবে এবং দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত এলএনজি ক্রয় ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে।
পূর্ববর্তী প্রকল্প ও বিশেষজ্ঞ মতামত
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ জুন বিশ্বব্যাংকের বোর্ড মূল ৩৫ কোটি ডলারের ‘এনার্জি সিকিউরিটি এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট’ অনুমোদন করেছিল। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এলএনজির দাম বেড়েছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশকে বড় ধরনের আর্থিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “জ্বালানি খাতের সংস্কার এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের সঙ্গে চলমান আলোচনার অংশ হিসেবেই বিশ্বব্যাংক এই সহায়তা দিচ্ছে। জ্বালানি ঘাটতি এড়ানো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র এনার্জি বিশেষজ্ঞ ও প্রকল্পটির টাস্ক টিম লিডার ওলাইয়িঙ্কা আদেবেরি বলেন, “অন্যান্য জ্বালানির তুলনায় গ্যাস তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং কম কার্বন নিঃসরণকারী। তাই এলএনজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।” পাশাপাশি এটি ব্যয়বহুল তরল জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আর্থিক সাশ্রয়েও ভূমিকা রাখবে বলে জানান তিনি।



