নতুন অর্থনৈতিক রূপরেখায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন দেখছে সরকার
নতুন অর্থনৈতিক রূপরেখায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার পরিবর্তে এবার একটি নতুন কৌশলগত উন্নয়ন কাঠামো গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। এই নতুন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা।

এই যাত্রার প্রথম ধাপ হিসেবে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এমন এক সময়ে ধরা হচ্ছে, যখন চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে বড় ধরনের সংশয় দেখা দিয়েছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকটের কারণে উন্নয়ন সহযোগীরা প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে আনছে, অন্যদিকে সরকার প্রবৃদ্ধির গতি বাড়িয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে চাইছে।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা

চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, যা সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। সরকারের লক্ষ্য ছিল কড়া মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীল খাতকে সচল রাখা। কিন্তু অর্থবছর শেষের দিকে এসে বাস্তব চিত্র বলছে, এই লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধের অর্থনৈতিক সূচকগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিল্প ও সেবা—উভয় খাতেই প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর। জ্বালানি সংকট, কাঁচামাল আমদানিতে কড়াকড়ি এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকটের কারণে উৎপাদন খাত আশানুরূপ গতি পায়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস

বাংলাদেশ সরকারের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের মূল্যায়ন বরাবরই কিছুটা রক্ষণশীল ও বাস্তবভিত্তিক। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছে। সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে। অন্যদিকে আইএমএফ তাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক আউটলুকে এটি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। উন্নয়ন সহযোগীদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, দুর্বল রাজস্ব আদায় এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে, যা প্রবৃদ্ধির গতিকে টেনে ধরছে।

মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের শর্ত

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রতিবছর গড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা আবশ্যক। সেই কারণেই আসন্ন বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রায় এই সাহসিকতা বা উচ্চাভিলাষ দেখানো হচ্ছে। সরকার মূলত কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, মেগা প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করতে চায়।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "আমাদের লক্ষ্য থাকা ভালো এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্ন দেখা যৌক্তিক। কিন্তু বাস্তবতাকে অস্বীকার করে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ানো ঠিক হবে না। বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থবির। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কম। এ অবস্থায় প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে বিনিয়োগের হার জিডিপির অন্তত ৩২ থেকে ৩৩ শতাংশে উন্নীত করতে হবে, যা এখন মাত্র ২৭-২৮ শতাংশে আটকে আছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সুশাসন নিশ্চিত না করে কেবল লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে অর্থনৈতিক স্বস্তি আনা যাবে না।"

সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, "বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা বাড়িয়ে ধরাটা স্বাভাবিক। এটি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়। তবে মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রবৃদ্ধির গুণগত মান ও অর্থায়ন। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে গেলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি।"