যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর (ইউএসটিআর) জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি প্রতিরোধে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত না হলেও, এটি কার্যকর হলে বাংলাদেশের রফতানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, মারাত্মক চাপের মুখে পড়বে।
প্রস্তাবিত শুল্ক ও বাংলাদেশের অবস্থান
প্রস্তাব অনুযায়ী, যেসব দেশ আংশিক বা পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তাদের ওপর ১০ শতাংশ এবং যেসব দেশ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, তাদের ওপর সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১০ শতাংশ শুল্কের সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য বা কাঁচামাল আমদানি করে না বাংলাদেশ। এমনকি তৈরি পোশাক শিল্পসহ কোনও খাতেই জোরপূর্বক শ্রমের চর্চা নেই।”
শুনানি ও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ইউএসটিআর প্রস্তাবিত শুল্ক নিয়ে প্রকাশ্য শুনানি করবে। সোমবার (৬ জুলাই) পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর লিখিত মতামত জমা নেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার এই শুনানিতে অংশ নিচ্ছে না। সরকারের অবস্থান হলো, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমেই বিষয়টির সমাধান করা হবে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুনানিতে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ তার অবস্থান তুলে ধরলে ইতিবাচক বার্তা যেত।
তদন্তের পটভূমি ও প্রভাব
গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। ইউএসটিআরের অভিযোগ, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ভবিষ্যতে বাজারে প্রবেশাধিকার শুল্কহারের পাশাপাশি শ্রম অধিকার, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার দিয়েও মূল্যায়ন করা হবে।
বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি ও করণীয়
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক বাজার। নতুন শুল্ক কার্যকর হলে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে, ফলে ক্রেতারা ভিয়েতনাম, ভারত বা মেক্সিকোর মতো দেশে ঝুঁকতে পারেন। রফতানি আয় কমলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি শ্রমমান ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা নিয়ে তথ্যভিত্তিক প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রতি ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে।”
সমান্তরাল তদন্ত ও ভবিষ্যৎ
জোরপূর্বক শ্রম ইস্যুর পাশাপাশি বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা নিয়েও পৃথক তদন্ত চলছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট শিল্প এই তদন্তের আওতায় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্ববাজারে মূল্য বিকৃতি তৈরি করছে। বাংলাদেশ দাবি করছে, শিল্প সম্প্রসারণ বৈশ্বিক চাহিদা ও বেসরকারি বিনিয়োগের কারণে হয়েছে, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির কারণে নয়।



