সংসারের তাগিদে ফুটপাতে বসেছেন পারভীন, খেলনা বিক্রি করে সংসার চালানো দায়
সংসারের তাগিদে ফুটপাতে বসেছেন পারভীন, খেলনা বিক্রি করে সংসার চালানো দায়

গতকাল আগারগাঁওয়ে শিশুমেলার ডিএনসিসি ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্কের সামনের ফুটপাতে বসেছিলেন পারভীন আক্তার। সামনে সাজানো ছিল শিশুদের চুড়ি, মাথার ক্লিপ, ব্যান্ড, সেফটিপিন, মেহেদি, টুথব্রাশ, গলার মালা, তামার আংটি, খোঁপার কাঁটাসহ নানা পণ্য। বিকেল চারটা পর্যন্ত দুপুরের খাবার খাননি তিনি। সকাল ১০টায় আদাবর থানার সুনিবিড় এলাকার বাসা থেকে হেঁটে এসেছিলেন। এতক্ষণে মাত্র ৮০ টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে। সেই টাকা দিয়ে খাবার কিনলে হাতে আর কিছু থাকবে না।

স্বামী হারানোর পর সংগ্রাম

আড়াই বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান পারভীনের স্বামী। আগে স্বামীর আয়েই সংসার চলত। মৃত্যুর পর সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে পারভীনের কাঁধে। তিনি এখন শ্যামলীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অফিসে রান্নার কাজ করেন। মাসে পান ১০ হাজার টাকা বেতন। কিন্তু বাসাভাড়াই দিতে হয় সাড়ে ৭ হাজার টাকা। বাকি টাকায় চারজনের সংসার চালানো প্রায় অসম্ভব।

পারভীনের দুই সন্তান। মেয়ের বয়স ১৮ বছর, ছেলের ১৪। একসময় দুজনই স্কুলে যেত। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর খরচ সামলাতে না পেরে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। আক্ষেপ করে পারভীন বলেন, ‘তিনবেলা খাওন জোটাতেই দায়। পড়াশোনা করাব কেমনে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ধার করে ব্যবসা শুরু

সংসারের আয় বাড়াতে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে সাত হাজার টাকা ধার করেছিলেন পারভীন। সেই টাকা দিয়ে পুরান ঢাকার চকবাজার থেকে পণ্য কিনে ফুটপাতে বিক্রি শুরু করেন। তবে ব্যবসার অভিজ্ঞতা না থাকায় বেশি দামে পণ্য কিনে ফেলেছিলেন। এখন কিনে আনা দামের চেয়েও কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। গত দুই মাসে মাত্র ১ হাজার ৭০০ টাকার পণ্য বিক্রি করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ‘ধার কইরা টাকা আনছিলাম। এখন চালানই ওঠাইতে পারতাছি না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অভাবের সংসারে অন্তত ছেলেটাকে কোথাও কাজে দিতে চান। কিন্তু ভালো কোনো কাজের খোঁজ পাননি। অনেককেই বিষয়টি বলেছেন, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। আত্মীয়স্বজন সাহায্য করলে কোনোভাবে মাস কেটে যায়। সহযোগিতা না মিললে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রামে ফিরে যাওয়ারও সুযোগ নেই। স্বামীর রেখে যাওয়া ঘরটি শাশুড়ি ও ননদের দখলে।

রাজীব মিয়ার খেলনা ব্যবসা

পারভীনের পাশেই ২৮ বছর বয়সী রাজীব মিয়া খেলনা বিক্রি করছিলেন। সামনে সাজানো বেলুন, বাঁশি, চরকি, পুতুল, প্লাস্টিকের হাঁস-মুরগি, বল আর হাওয়াই মিঠাই। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার বাসিন্দা রাজীব ৯ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। কিন্তু এখন ব্যবসা আগের মতো নেই। পাইকারি বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়েছে, অথচ ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতে চান না।

মাসে গড়ে প্রায় দুই হাজার টাকার খেলনা বিক্রি করেন রাজীব। সেখান থেকে লাভ থাকে মাত্র ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। বর্তমান বাজারে এই লাভ দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘চালান গেলে আর লাভ থাহে না।’

সংসারের হিসাব মেলানো দায়

স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে এক কক্ষের আধাপাকা ঘরে থাকেন রাজীব। মাসে সাড়ে সাত হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। সংসারের হিসাব মেলাতে গিয়ে খাবারের তালিকাও ছোট হয়ে এসেছে। তিনি বলেন, ‘বেশির ভাগ দিনে আলুভর্তা আর ডাল দিয়াই চলতে হয়। সবকিছুর যেই দাম, ভালো কিছু কিনতে গেলেই খরচ বেশি লাগে। অত টাকা পাব কই?’

গ্রামের বাড়িতে থাকা বাবা-মা ও ছোট বোনের কাছে প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠাতে হয়। তাই দাম বেশি হওয়ায় মাছ-মাংস খুব একটা কেনা হয় না। তিনি বলেন, ‘মাছ-মোরগ কিনতে গেলেই টাকা শেষ অয়। পোলাও এখন বড় অইছে। তার পেছনেও খরচ লাগে। সব খরচ দিয়া কুলায় না।’

রাজীব হাওলাদারের ভুনা খিচুড়ি

ধানমন্ডির ১৫/এ নম্বর সড়কে রাজীব হাওলাদার ভ্যানে ভুনা খিচুড়ি বিক্রি করছিলেন। ডিমসহ এক প্লেট খিচুড়ির দাম ৫০ টাকা, ডিম ছাড়া ৩০ টাকা। সঙ্গে আলুভর্তা, লেবু আর পেঁয়াজভর্তা দেওয়া হয়। এখানে খেতে আসেন পথচারী, দারোয়ান, কেয়ারটেকার, রিকশাচালক, দিনমজুরসহ নিম্ন আয়ের মানুষ। ভ্যানটি রাজীবের নিজের নয়, অন্যের ভ্যানে দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন। মাসে আয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা।

রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের পাশে এক কক্ষের আধা পাকা ঘরে পরিবার নিয়ে থাকেন রাজীব। বাসাভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। তাঁর দুই সন্তান। ১০ বছর বয়সী মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে, ছেলের বয়স ৩ বছর। ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ বিল (৮০০-৯০০ টাকা) ও মেয়ের পড়াশোনার খরচ বাদে বাকি টাকায় চারজনের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো কঠিন।

রাজীব হাওলাদার বলেন, ‘এই বাজারে ২০-৩০ হাজার টাহায়ও কিছু অয় না। রুমভাড়া আর মাইয়ার খরচে চলে যায় ৮ হাজার। বাকি ১০ হাজার টাহায় চারজন মানুষের খরচ মেটাই কেমনে কন?’

কষ্টের সংসার

গ্রামের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়ায় থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছেও প্রতি মাসে কিছু টাকা পাঠাতে হয়। সব হিসাব মিটিয়ে নিজের বা পরিবারের জন্য ভালো কিছু কেনার সামর্থ্য থাকে না। রাজীব বলেন, ‘ভালো কিছু কিনমু কোহানতে? বউরে দিলে বাচ্চাগো হয় না। বাচ্চাগো দিলে বউরে কিছু দেওয়ার পারি না। আমার কথা তো বাদই দিলাম।’

ঢাকার জীবনযাত্রার ব্যয় এত বেশি যে মাস শেষে হাতে কিছু থাকে না। সন্তানদের জন্য ভালো কিছু কিনতে ইচ্ছা হলেও প্রায়ই খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়। রাজীব বলেন, ‘এক কেজি মাছ ভালো দেখে নিতে গেলেই ৫০০ টাকা লাগে। মাস শেষে খরচের টাকা মেলে না। বেশি খরচ করলে বাসাভাড়া দিতে পারি না।’ তাই প্রতি মাসেই নতুন করে হিসাব মেলানোর লড়াই। শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘এত খরচে টেকা দায়। হগল সময় মাইপা মাইপা চলন লাগে।’