চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম টাকা খরচ হয়েছে। গত জুলাই থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত অর্থাৎ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এই পরিস্থিতি দেখা গেছে। গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা কম খরচ হয়েছে। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্প কম বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানুষের হাতে টাকা কম যাচ্ছে। অন্যদিকে এডিপি বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত টাকার জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের বহুদিনের সমস্যা তো আছেই।
৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন ৩৬ শতাংশ
আজ রোববার বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) জুলাই থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়নের হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে। ওই সময়ে উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ হয়েছে ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন হার ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। টাকার অঙ্ক ও বাস্তবায়ন হার, উভয় দিক বিবেচনা করলে গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত অর্থবছর ছাড়া আগের তিন অর্থবছরে ৯ মাসে গড়ে এক লাখ কোটি টাকার মতো খরচ হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে এমনিতেই সক্ষমতার অভাব আছে। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যাচাই–বাছাই করে প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং টাকা খরচে কিছুটা কৃচ্ছ্র সাধনের কারণে প্রভাব পড়েছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে।
কারা সবচেয়ে খারাপ করল
এডিপির মাধ্যমে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে থাকে। প্রতিবছর বাজেটের সময় এডিপির মাধ্যমে এসব মন্ত্রণালয়ের চলমান ও নতুন প্রকল্পে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ৯ মাসের প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র বেশ হতাশাজনক। যেমন সংসদবিষয়ক সচিবালয়ের একটি প্রকল্পে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে। কিন্তু গত ৯ মাসে এক টাকাও খরচ করা সম্ভব হয়নি। সংসদবিষয়ক সচিবালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার শূন্য।
চলতি অর্থবছরের ৯ মাস অর্থাৎ তিন–চতুর্থাংশ সময় পেরিয়ে গেলেও নিজেদের প্রকল্পের অনুকূলে বরাদ্দের ২৫ শতাংশও খরচ করতে পারেনি ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এই মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো পারফরম্যান্স সবচেয়ে দুর্বল। সংসদবিষয়ক সচিবালয় ছাড়া তালিকায় থাকা অন্য বিভাগ ও মন্ত্রণালয় হলো প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়; রেলপথ মন্ত্রণালয়; স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ; প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (থোক বরাদ্দসহ); স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ; জননিরাপত্তা বিভাগ; পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়; ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ; যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়; বাণিজ্য মন্ত্রণালয়; আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ; অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি); নির্বাচন কমিশন সচিবালয়; পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ।
কেন বাস্তবায়ন কম
প্রতিবছরের মতো এবারও কেন এডিপি বাস্তবায়ন কম হলো, তা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিভিন্ন কারণে এডিপি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। যেমন—
- প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের সক্ষমতার অভাব। কর্মপরিকল্পনা অনুসারে যথাসময়ে কাজ শেষ করতে না পারা।
- ঠিকাদারদের ঢিলেঢালাভাবে কাজ শেষ করার চিন্তাভাবনা। যেমন—এক মাসে যে কাজ শেষ করা সম্ভব, খরচ বাঁচাতে সেই কাজ কম লোকবল নিয়োগ দিয়ে তিন মাসে শেষ করা।
- প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা আছে। মামলা–মোকদ্দমার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায় না।
- চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। এর মানে, সরকারের টাকার জোগানে টান পড়েছে। সরকার বেতন–ভাতা, দেশি–বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধসহ অবধারিত খরচগুলো আগে মেটায়। এরপর উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থের জোগান দেয়। এভাবে অগ্রাধিকারে পিছিয়ে যায় উন্নয়ন প্রকল্প।
- প্রকল্প নেওয়ার সময় সম্ভাব্যতা যাচাই ঠিকমতো না হওয়ায় পরে নকশা পরিবর্তন, ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণ হয়। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন মূল্যায়নে এটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত।
- অনুমোদন, দরপত্র, ক্রয়—সব পর্যায়ে প্রশাসনিক জটিলতা ও ধীর সিদ্ধান্তের কারণে দীর্ঘসূত্রতা থাকে। এতে প্রকল্পের শুরুতেই সময় নষ্ট হয়।
- ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও জটিলতা, পুনঃ দরপত্র বা আপত্তির কারণে কাজ শুরু করতেই দেরি হয়।
- তদারকি ও জবাবদিহির দুর্বলতায় প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না হলে সমস্যা জমতে থাকে, সময়মতো সমাধান হয় না।
- সরকার বা নীতির পরিবর্তনে প্রকল্পের অগ্রাধিকার বদলে যেতে পারে, ফলে কাজ থেমে যায় বা ধীর হয়। যেমন এবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে নতুন সরকার এসে পুরোনো কিছু প্রকল্প যাচাই–বাছাই করতে কমিটি গঠন করেছে। সেই কমিটি এখন যাচাই করে সুপারিশ করবে। এই সময়ে হয়তো ওই সব প্রকল্পের কাজে ধীরগতি থাকবে, অর্থছাড় কমবে।
- দুর্নীতি ও অপচয়ের কারণে কাজের মান খারাপ হওয়া, অপ্রয়োজনীয় ব্যয়—এসব কারণে প্রকল্প বারবার সংশোধন করতে হয়, সময় বাড়ে।



