আগামী বাজেটে করহার বাড়বে না, বাড়বে করের ভিত্তি: প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা
আগামী বাজেটে করহার বাড়বে না, বাড়বে করের ভিত্তি

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত প্রাক্-বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে নতুন করে করহার বাড়ানো হবে না। তবে কর আদায়ের ভিত্তি বাড়িয়ে রাজস্ব বাড়ানো হবে।

আজ শনিবার রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিপিআরসি আয়োজিত এক প্রাক্-বাজেট আলোচনায় এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান প্রমুখ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

করহার না বাড়িয়ে ভিত্তি বাড়ানোর ঘোষণা

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ সম্পদ সেটা করের ক্ষেত্রে হোক অথবা করবহির্ভূত রাজস্ব হোক, দুটি ক্ষেত্রেই আমরা পরিমাণ বাড়াব। তবে করের হার বাড়াব না।’

রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতির কারণে দেশে কর আদায় তলানিতে রয়েছে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ। তিনি বলেন, পুরোটাই হচ্ছে এসআরও বাণিজ্য। আপনি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সংশ্লিষ্ট হলে আপনাকে কর অব্যাহতি দেওয়া হবে। এমন ভূরি ভূরি নজির আছে। এটাই মূল অসুখ। এই অসুখ দূর করতে হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এনবিআর চেয়ারম্যানের বক্তব্য

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানান, আগামী অর্থবছরের বাজেটে করের আওতা বাড়াতে বেশ কিছু নতুন জায়গা থাকবে। তবে রাজস্ব নীতিতে বাণিজ্য সহজীকরণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সাধারণ জনগণ যাতে দ্রব্যমূল্যের কশাঘাত থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি পায়, সে বিষয়ে বাজেটে খেয়াল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় তিন চ্যালেঞ্জ

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে—রাজস্ব ঘাটতি, হয়রানি এবং কর ফাঁকি। এর মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার নিচে রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি অনেক দিনের প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর ফাঁকি এখন একটি পদ্ধতিগত সমস্যা। আর হয়রানি বেসরকারি খাত ও সাধারণ নাগরিক উভয়ের জন্যই একটি রূঢ় বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

এমন অবস্থায় হোসেন জিল্লুর রহমান তিনটি অবশ্যকরণীয় উল্লেখ করেন—এক. রাজস্ব কাঠামোতে নির্ভরযোগ্য ও পর্যায়ক্রমিক সংস্কার। এটিই মূল কাজ। দুই. প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে রাজস্ব সংস্কার করা। তিন. সামাজিক অগ্রগতির সঙ্গেও রাজস্ব সংস্কারকে মেলানো।

করব্যবস্থায় সংস্কারের আহ্বান

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান জাইদি সাত্তার বলেন, বর্তমান করব্যবস্থা অনেক বেশি মান্ধাতা আমলের। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত যে সংস্কারগুলো হয়েছিল, ২০-২৫ বছর ধরে অর্থনীতি সেই সংস্কারগুলোর সুফল ভোগ করছে। গত দুই দশকে কার্যত কোনো বড় ধরনের কর সংস্কার হয়নি। ফলে সংস্কারের কাজগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে আছে।

বাংলাদেশে করের হার বাড়ানোর আর কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করেন জাইদি সাত্তার। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই এখানে বা ওখানে কর বাড়ানোর বিভিন্ন খামখেয়ালি পরামর্শ শুনি। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে করের হার বাড়িয়ে বাড়তি রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অনেক ক্ষেত্রে করের হার কমানোই বরং সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য (ট্রেড) কর অনেক বেশি। এটি কমানো প্রয়োজন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা বড় ধরনের কর–জিডিপির ভারসাম্য ফাঁদের দিকে ধাবিত হচ্ছি। এই আলোচনা ইতিমধ্যে এসেছে। যা আসেনি তা হলো, এই অবস্থা আমাদের মূলত একটি “ঋণের ফাঁদের” দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, কয়েক বছর আগেও আমাদের জাতীয় ব্যয়ের অগ্রাধিকার তালিকায় শিক্ষা খাত ছিল সবার ওপরে। কিন্তু বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধই ব্যয়ের প্রধান খাতে পরিণত হয়েছে।’

হয়রানির ভয় থেকে মুক্তি চান ব্যবসায়ীরা

অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, ‘আমরা একটা করব্যবস্থার মধ্যে আছি, যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত হয়রানির ভয় পাই। এই ভয় ভাঙতে হবে। বাংলাদেশে আমরা যারা কর দিই, তারা নিজেরটা দিই, আবার যারা দেন না, তাদেরটাও দিই। আমরা এটা থেকে মুক্তি চাই।’

এ ছাড়া করজাল বাড়ানোর কথা না বলে করের ভিত্তি বাড়ানোর আলোচনা করার পরামর্শ দেন নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, নেট হচ্ছে একই জালে বারবার একই মাছ ধরা।

দেশে কর ও ভ্যাটের সব নিয়ম আছে। কিন্তু কতজন মানুষ প্রকৃতপক্ষে তা মেনে চলছেন, সেই প্রশ্ন তোলেন ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিমিন রহমান। তিনি বলেন, ‘কতজন মানুষ শুল্ক, কর, সম্পূরক শুল্কের নিয়ম মেনে চলছেন? এ ক্ষেত্রে আমাদের তদারকি কোথায়? অথচ এখানেই রাজস্বের মূল অপচয় বা লিকেজ হচ্ছে। ফলে আমরা যারা নিয়ম মেনে চলছি, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছি।’

সিমিন রহমান আরও বলেন, ‘এনবিআর সুগার ট্যাক্সের (চিনিযুক্ত পণ্যের ওপর কর) কথা বলছে। তবে বিভিন্ন দেশ যে সুগার ট্যাক্স গ্রহণ করেছে, আমরা যদি সেটি বিবেচনা করতাম, তবে খুব ভালো হতো।’

করকাঠামোতে জটিলতা কমানোর পরামর্শ দেন নিট পোশাকশিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক। তিনি বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাত রপ্তানির ওপরে একটি প্রণোদনা তথা ভর্তুকি পায়। কিন্তু এই ভর্তুকির ওপরে ১০ শতাংশ আয়কর আছে। অর্থাৎ আপনি সাহায্য দিচ্ছেন, আবার সাহায্যের ওপর আয়কর বসাচ্ছেন। এটা নিয়ে আমাদের জটিলতায় পড়তে হয়।’