ঈদে নতুন নোটের অভাব: সাধারণ মানুষের জন্য দুঃসংবাদ, ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য সুখবর
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে এবার সাধারণ নাগরিকদের জন্য টাকার নতুন নোট ছাড়বে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এই সিদ্ধান্তের ফলে বেশিরভাগ মানুষকে পুরানো নোট দিয়েই ঈদ উদযাপন করতে হবে, এমনকি শিশু-কিশোরদের হাতেও নতুন টাকা উঠবে না। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন নোটের বিশেষ ব্যবস্থা করেছে, যা নিয়ে সমাজে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও অভ্যন্তরীণ আদেশ
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি একটি অভ্যন্তরীণ আদেশ জারি করেছে, যার মাধ্যমে রোববার (৮ মার্চ) থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন নোট সংগ্রহ করতে শুরু করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন পক্ষপাতমূলক উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করছেন অনেক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা। প্রতিবছর ঈদের সময় টাকার নতুন নোটের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, বিশেষত ঈদ সালামি হিসেবে নতুন নোট অত্যন্ত জনপ্রিয়। রাজধানীর মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন স্থানে নতুন নোট ও ছেঁড়া টাকার বেচাকেনার অস্থায়ী দোকান গড়ে ওঠে, যা ফুটপাতেই বেশি সক্রিয় থাকে এবং ঈদের সময় জমজমাট ব্যবসায় পরিণত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা ও নীতির পরিবর্তন
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এই সিদ্ধান্তের পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, একটি নোট ডিজাইন থেকে বাজারে ছাড়তে প্রায় দেড় বছর সময় লাগে, এবং একসঙ্গে ৯ ধরনের নোট ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়ায় বড় চাপ তৈরি হয়েছিল। তাই গত বছর থেকেই এই রীতি বদলানো হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নতুন নোট বাজারে ছাড়া একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, এবং এর জন্য আলাদা কোনো উপলক্ষের প্রয়োজন নেই। বাজারে ব্যবহারের অনুপযোগী নোটগুলো ধীরে ধীরে নতুন নোট দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হবে।
একইসঙ্গে, খোলা বাজারে নতুন নোট বিক্রির সঙ্গে ব্যাংকের কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, কিছু কর্মকর্তা ব্যাংক খাতের সংস্কার চাইলেও নিজেদের সংস্কার চান না। তারা নগদ টাকার ব্যবহার কমাতে চান, কিন্তু নিজেরা ঠিকই নগদ টাকার ব্যবস্থা করে নেন, যা একটি দ্বিমুখী নীতির উদাহরণ বলে মনে করা হচ্ছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য কোটা নির্ধারণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কে কত টাকার নতুন নোট নিতে পারবেন, তা নিয়ে ৩ মার্চ একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। এই আদেশ অনুসারে, নির্বাহী পরিচালক, পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক ও যুগ্ম পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তারা প্রত্যেকে ১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার সমপরিমাণ নতুন নোট নিতে পারবেন। অন্যদিকে, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও অন্যান্য কর্মচারীরা সর্বোচ্চ ৬৮ হাজার টাকার নতুন নোট নিতে পারবেন। ৮ থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত চাহিদা অনুসারে নতুন নোট নিতে পারবেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এই ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কারণ অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতার চেয়ে বেশি নতুন নোট নিতে পারছেন। অনেকে মনে করেন, এই নতুন নোট অবৈধ উপায়ে লেনদেনের মাধ্যমে ফুটপাতের নতুন নোট ও ছেঁড়া টাকার ব্যবসায়ীদের কাছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে, যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে, পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নীতির স্ববিরোধিতা নিয়ে গুরুতর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।



