নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির (১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ) ডিলার নিয়োগে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ফলে ওই বছরের ১৪ অক্টোবর ৯টি ইউনিয়নের ৫৩ জন ডিলারের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে সাময়িকভাবে ৯টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণ অব্যাহত থাকলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে নতুন করে ডিলার নিয়োগ না হওয়ায় কর্মসূচির প্রায় ২২ হাজার ৫০০ কার্ডধারী চাল উত্তোলন করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থবির
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণ সচল রাখতে নতুন করে ডিলার নিয়োগের জন্য ২০২৫ সালের ১৭ জুন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর ৯টি ইউনিয়ন থেকে ৫৩টি ডিলারশিপের বিপরীতে ২৫৪টি আবেদন পড়ে। কিন্তু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও নতুন ডিলার নিয়োগ না হওয়ায় চাল বিতরণ নিয়ে সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে আরও জানা গেছে, ৯টি ইউনিয়নের প্রায় ২২ হাজার ৫০০ কার্ডধারীর বিপরীতে প্রতি মাসে ৬৮ হাজার ৮৫০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়। এসব চাল বিতরণের বিপরীতে প্রতি মাসে প্রায় ১৩ লাখ টাকা কমিশন আসে। বছরে ৬ মাস চাল বিতরণ হলে কমিশনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮০ লাখ ১৬ হাজার টাকা, যা আগে ৫৩ জন ডিলার পেতেন। বর্তমানে এই কমিশনের টাকা চেয়ারম্যানরা পাচ্ছেন, যা নতুন ডিলার নিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সুবিধাভোগীদের ভোগান্তি
মাগুড়া ইউনিয়নের সিঙ্গেরগাড়ী গ্রামের সুবিধাভোগী আফছার আলী জানান, আগে সিঙ্গেরগাড়ী বাজারে ডিলার চাল বিতরণ করতেন। তখন সুবিধামতো সময়েই চাল নেওয়া যেত। বর্তমানে ডিলার না থাকায় ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দিন নষ্ট করে চাল আনতে হয়। এতে একদিকে ভ্যানভাড়া বেশি লাগে, অন্যদিকে দৈনিক প্রায় ৬০০ টাকা মজুরি নষ্ট হয়।
গাড়াগ্রাম বাবুর বাজারের কার্ডধারী শ্রীমতি অঞ্জনা রানী বলেন, আগে ডিলার বাড়ির কাছেই ছিলেন। এখন কাজকর্ম ফেলে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের গুদাম থেকে চাল আনতে হয়। সরকারি দরে ৩০ কেজি চাল ৪৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও যাতায়াত ও সময়ের খরচ মিলিয়ে তা ১১০০ থেকে ১২০০ টাকায় দাঁড়ায়। ফলে অনেকেই চাল নিতে যান না।
একই ধরনের অভিযোগ করেন বড়ভিটা, পুটিমারী ও কিশোরগঞ্জ সদর এলাকার কার্ডধারী আমেনা, শশিবালা, আমিনুর রহমান ও আবেদা খাতুন। তারা বলেন, আগের ডিলাররা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমানে যারা চাল বিতরণ করছেন, তাদের মধ্যেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোকজন রয়েছেন। এতে করে সাধারণ দরিদ্র মানুষই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলার নিয়োগে বিলম্বের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আবেদনকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সহযোগী ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাদের রাজনৈতিক পরিচয়সহ তদন্তের জন্য প্রশাসনকে অনুরোধ করা হলেও তা করা হয়নি। এ কারণেই ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া থমকে আছে।
উপজেলা জামায়াতের আমির আব্দুর রশিদ শাহ বলেন, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে ওজনে কম দেওয়া, বস্তা খুলে চাল বিতরণ এবং অনেক কার্ডধারীকে চাল না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ দ্রুত ডিলার নিয়োগের দাবি জানান তিনি।
প্রশাসনের বক্তব্য
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা তৌহিদুর রহমান বলেন, ডিলার নিয়োগের জন্য যারা আবেদন করেছেন তাঁদের আবেদন সরকারী নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই বাছাই সম্পন্ন শেষ করে উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটির সভাপতির নিকট জমা করা হয়েছে। কমিটির সভাপতি উচ্ছে করলেই একদিনের ব্যবধানে ডিলার নিয়োগ দিতে পারবেন। প্রশাসনিক কোন দুর্বলতা রয়েছে কিনা প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আমাদের কোন দুর্বলতা নেই। এর বেশি তিনি বলতে অপারগত প্রকাশ করেন।
উপজেলা খাদ্যবান্ধব কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফুর রহমান বলেন, আমি এখানে নতুন যোগদান করেছি। খাদ্যবান্ধব কর্মসুচীর ডিলার নিয়োগের বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে ব্যাবস্থা গ্রহন করব।



