এক সময় দেশের সম্ভাবনাময় রফতানি খাতগুলোর অন্যতম ছিল চামড়া শিল্প। তৈরি পোশাক খাতের পর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় উৎস হিসেবে এ শিল্পকে ঘিরে ছিল সরকারের উচ্চ প্রত্যাশা। কিন্তু গত এক দশকে ধারাবাহিক সংকট, রফতানি হ্রাস, পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা এবং ব্যাংকঋণ খেলাপির কারণে শিল্পটি এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
ঋণ কমছে বছর বছর
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কাঁচা চামড়া কেনার জন্য ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের লক্ষ্য ছিল ৬৪৪ কোটি টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিতরণ হয় মাত্র ৬৫ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২০২৪ সালে বিতরণ হয়েছিল প্রায় ১২৫ কোটি টাকা। অথচ চলতি বছর দেশে এক কোটির বেশি গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া কোরবানি হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ২৯৬ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বাস্তবে বিতরণ হয়তো ১০০ কোটিরও নিচে নেমে আসবে।
খেলাপির চাপে ব্যাংকগুলোর অনীহা
রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চামড়া খাতে তাদের মোট ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৭৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৫৩ কোটি টাকাই খেলাপি। বাকি ৩১৪ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হলেও বেশির ভাগ গ্রাহক নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন। এ কারণে চলতি বছর চামড়া খাতে নতুন ঋণ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। অগ্রণী ব্যাংক চলতি বছর ৯১ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে ব্যাংকটির কর্মকর্তারাও নিশ্চিত নন শেষ পর্যন্ত কত টাকা বিতরণ করা সম্ভব হবে। অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “চামড়া খাতের বেশির ভাগ ব্যবসায়ী এখন খেলাপি। ফলে ঋণ বিতরণে ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।”
ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ
ট্যানারি মালিকদের দাবি, ব্যাংকগুলো কাগজে-কলমে বড় অঙ্কের ঋণ বরাদ্দ দেখালেও বাস্তবে সেই অর্থ ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছায় না। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বলেন, “সরকার লবণ বিতরণসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী ঋণ না পেলে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণে সংকট তৈরি হবেই।” সংগঠনটির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ জানান, এবার প্রায় এক কোটি পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছে ট্যানারিগুলো। এজন্য প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাংকিং সহায়তা না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা নিজস্ব মূলধন থেকে সীমিত আকারে অর্থ ছাড় করছেন।
২০১৯ সালের ধাক্কা এখনও কাটেনি
চামড়া শিল্পের বর্তমান সংকটের শিকড় আরও পুরোনো। ২০১৩ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই শিল্পটির কাঠামোগত দুর্বলতা সামনে আসতে শুরু করে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০১৯ সালের কোরবানির ঈদে। সে বছর সরকার নির্ধারিত দাম ঘোষণা করলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর হয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানে গরুর চামড়া ২০০-৩০০ টাকায় বিক্রি হয়। কোথাও কোথাও বিক্রি না হওয়ায় চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলা বা ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। এর পর থেকেই মৌসুমি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের বড় অংশ এ ব্যবসা থেকে সরে যেতে শুরু করেন। ফলে চামড়া সংগ্রহ ব্যবস্থায় ভাঙন তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারেও ধস
চামড়া শিল্পের সংকট শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছে। সাভার ট্যানারি শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না দেশের ট্যানারিগুলো। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) সনদ পেতে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ। এ কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় ব্র্যান্ডগুলোর অনেকেই বাংলাদেশ থেকে চামড়া সংগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে দেশের চামড়ার বড় অংশ রফতানি হচ্ছে মূলত চীনে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশ থেকে ২৭ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের চামড়া রফতানি হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ কোটি ৮২ লাখ ডলারে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রফতানি হয়েছে মাত্র ১০ কোটি ৮৩ লাখ ডলারের চামড়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চামড়া খাতে মোট ব্যাংকঋণের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা।
কী করছে সরকার
এবার কোরবানির চামড়া নিয়ে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২-৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭-৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। খাসির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২৫-৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২-২৫ টাকা। চামড়া সংরক্ষণের জন্য সারা দেশের মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিতরণ করেছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিভাগভিত্তিক মনিটরিং টিম গঠন করেছে। লবণ ছাড়া চামড়া পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচার ঠেকাতে বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “চামড়া খাতে ঋণপ্রবাহ সচল রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী খেলাপি গ্রাহকদের নতুন ঋণ দেওয়ার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”
আবারও কি লোকসানের মুখে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা?
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। কারণ তারা স্থানীয়ভাবে নগদ টাকায় চামড়া সংগ্রহ করেন। পরে আড়তদার বা ট্যানারির কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু ট্যানারিগুলো যদি পর্যাপ্ত অর্থ না পায়, তাহলে বাজারে চাহিদা কমে যাবে। আর তখন গ্রামের সংগ্রহকারীরা বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করবেন অথবা সংরক্ষণ করতে না পেরে ফেলে দেবেন। অতিরিক্ত গরম, অনিয়মিত বৃষ্টি এবং দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থাও এবার বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে। সময়মতো লবণ না দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সব মিলিয়ে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চামড়া শিল্প আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা উদ্যোগ নিলেও মূল সংকট রয়ে গেছে অর্থায়নে। আর সেই সংকট কাটানো না গেলে, এবারও দেশের কোটি কোটি টাকার কাঁচা চামড়া ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।



