দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম দিয়ে মসলা আমদানিতে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটায় সরকারের রাজস্ব আদায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমে গেছে। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭.৭৮ শতাংশ কম।
মসলা আমদানি কমেছে
ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় এবার মসলা আমদানি কমেছে। তবু বাজারে সংকট নেই। আছে পর্যাপ্ত মজুত। স্বাভাবিক আছে সরবরাহ। ফলে ঈদুল আজহা সামনে রেখে এবার দেশে মসলার কোনও সংকট হবে না। এমনকি দাম বাড়ারও শঙ্কা নেই।
আমদানিকারকরা বলছেন, বৈশ্বিক উত্তেজনা ও যুদ্ধজনিত পরিস্থিতি বিরাজ করলেও মসলা সরবরাহ ঠিক আছে। ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ভারত থেকে নিয়মিত মসলা আমদানি করা হয়। পাশাপাশি বিদ্যমান মজুত ঠিক আছে। তবে খুচরা বাজারের দাম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের তুলনায় অনেক বেশি।
আমদানি কমায় রাজস্বও কমেছে
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫-এর ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন মসলা থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। দারুচিনি থেকে ১১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা, রসুন থেকে ১০৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, এলাচ থেকে ১০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা, জিরা থেকে ৮৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা, লবঙ্গ থেকে ৫৭ কোটি টাকা, গোলমরিচ থেকে ২৯ কোটি ২৬ লাখ টাকা, আদা থেকে ২৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, জয়ত্রী থেকে ছয় কোটি ১৩ লাখ টাকা, পেঁয়াজ থেকে পাঁচ কোটি ৮১ লাখ টাকা, হলুদ থেকে চার কোটি ২১ লাখ টাকা, জায়ফল থেকে এক কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং মরিচ থেকে ৪৩ লাখ টাকা রাজস্ব এসেছে।
২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬-এর ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে দারুচিনি থেকে ১৪৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, রসুন থেকে ৪০ কোটি নয় লাখ টাকা, এলাচ থেকে ৭২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা, জিরা থেকে ৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, লবঙ্গ থেকে ৩৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, গোলমরিচ থেকে ৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা, আদা থেকে ৩৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা, জয়ত্রী থেকে সাত কোটি ১১ লাখ টাকা, পেঁয়াজ থেকে তিন লাখ টাকা, হলুদ থেকে ছয় কোটি ৮২ লাখ টাকা, জায়ফল থেকে এক কোটি ১৭ লাখ টাকা ও মরিচ থেকে ৩৩ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
আমদানি কমেছে যেসব পণ্যের
গত বছরের আমদানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, রসুন আমদানি কমেছে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ, এলাচ ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ, জিরা ২৮ দশমিক ১ শতাংশ, লবঙ্গ ৪১ দশমিক ২ শতাংশ, পেঁয়াজ ২৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং মরিচ ২৩ দশমিক ২ শতাংশ।
কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে সাধারণত প্রতি বছর ১০-১২ শতাংশ আমদানি বাড়ে। গত বছর যে পরিমাণ মসলার চাহিদা ছিল এ বছর তার চেয়ে কমপক্ষে ১০ শতাংশ বেশি বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু আমদানি দেখলে বোঝা যায় তা আগের চাহিদার চেয়ে কমেছে। আমদানি কমেছে ৬২ হাজার টন।
যা বলছে কাস্টমস
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১২ ধরনের মসলাজাতীয় পণ্য আমদানি হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১২ ক্যাটাগরির মসলা মিলে আমদানি হয়েছিল দুই লাখ ১৫ হাজার ৫৪৫ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে একই সময়ে আমদানি হয় এক লাখ ৫৩ হাজার ৫৬০ দশমিক ৫ টন। গত অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫৫৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এবার রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪৫৭ কোটি সাত লাখ টাকা। প্রায় ৯৯ কোটি টাকা কমে এসেছে। শতাংশের হিসাবে ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ কম মসলা আমদানি হয়েছে এবার।’
খাতুনগঞ্জের মসলা ব্যবসায়ী মেসার্স আইমন এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমদানি কমলেও বাজারে মসলার সংকট নেই। কোনও কোনও মসলার আমদানি গত বছরের তুলনায় এবার কমেছে। দামও কমেছে। সীমান্ত উন্মুক্ত থাকায় অবৈধপথে মসলা আসছে। এক কেজি জিরা বৈধভাবে আমদানি করলে সরকারকে রাজস্ব দিতে হয় ৩০০-৩৫০ টাকা। এককেজি এলাচে শুল্ক দিতে হয় এক হাজার ৭৫০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু যারা চোরাই পথে আনছে তাদের বর্ডার খরচ দিতে হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। অবৈধপথে মসলা আসায় সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে তেমনি বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে।’



