৬৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) অংশ নিতে আগামী ২৪ জুন ঢাকা ছাড়ছে বাংলাদেশের ছয় খুদে গণিতবিদ। ‘কোনো চাপ নয়; বরং গণিত উপভোগ করাটাই আসল কথা’—এই বার্তা নিয়ে দলটি যাত্রা করছে। এ নিয়ে ২২তম বারের মতো আইএমওতে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ।
বেইজিংয়ে সামার ক্যাম্প, তারপর সাংহাই
সরাসরি সাংহাইয়ে না গিয়ে এবার প্রথমে বেইজিংয়ে যাবে দলটি। সেখানে ‘চতুর্থ আন্তর্জাতিক গণিত সামার ক্যাম্প ২০২৬’–এ অংশ নেবে শিক্ষার্থীরা। ক্যাম্প শেষে ১৩ জুলাই সাংহাইয়ে অনুষ্ঠেয় মূল প্রতিযোগিতায় যোগ দেবে তারা। ২০ জুলাই সমাপনী পর্বের মাধ্যমে শেষ হবে গণিতের এই বিশ্ব আসর। এবার বাংলাদেশসহ শতাধিক দেশের প্রায় ৬০০ প্রতিযোগী আইএমওতে অংশ নিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে দল পরিচিতি
আজ সোমবার বিকেলে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ ছয় শিক্ষার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেন।
লিখিত বক্তব্যে অধ্যাপক কায়কোবাদ বলেন, ২০০৫ সাল থেকে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ১টি স্বর্ণ, ৭টি রৌপ্য, ৪০টি ব্রোঞ্জ পদক ও ৪৭টি সম্মানজনক স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের এই অর্জন দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের গণিতচর্চার প্রতি আগ্রহ ও সক্ষমতার প্রতিফলন।
অধ্যাপক কায়কোবাদ আরও বলেন, প্রায় দুই দশক ধরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত গণিত উৎসব এখন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বড় আয়োজন হয়ে উঠেছে।
পৃষ্ঠপোষক ও আয়োজকদের বক্তব্য
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, এই শিক্ষার্থীরাই এখন আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে, তাদের সাফল্যের দিকে তাকিয়ে থাকবে পুরো দেশ। তিনি বলেন, দেশের মেধাবী তরুণদের বিকাশে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ভবিষ্যতেও এ ধরনের উদ্যোগে সহযোগিতা করে যাবে।
প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, দেশের তরুণদের সাফল্যের গল্পই সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে দিতে চায় প্রথম আলো। তিনি বলেন, সাধারণত মানুষ মনে করে দুঃসংবাদই বেশি পাঠক টানে; কিন্তু অভিজ্ঞতা বলছে, সুখবরের প্রতিও পাঠকের আগ্রহ কম নয়। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আনিসুল হক বলেন, তোমরা বাংলাদেশের জন্য আরও সুখবর নিয়ে আসো, যাতে সেই সাফল্যের গল্প দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
প্রস্তুতি ও নারী অংশগ্রহণ প্রসঙ্গ
বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের আগে বিভিন্ন সামার ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেদের প্রস্তুতি আরও শাণিত করার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে তিনি গণিত অলিম্পিয়াডে মেয়েদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এ প্রবণতা বদলাতে সম্মিলিতভাবে আরও কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির কোষাধ্যক্ষ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়া বড় দায়িত্ব হলেও সেটিকে অতিরিক্ত চাপ হিসেবে না নিয়ে মনোযোগ ও ‘সিরিয়াসনেস’ ধরে রাখা জরুরি।
দলের সদস্য ও নির্বাচন প্রক্রিয়া
এবার বাংলাদেশ দলের সদস্যরা হলেন:
- মনামী জামান – ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা (একাদশ শ্রেণি)
- জাওয়াদ হামীম চৌধুরী – ঢাকা ইমপিরিয়াল কলেজ (একাদশ শ্রেণি)
- এম জামিউল হোসেন – রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ (এসএসসি পরীক্ষার্থী)
- মো. রায়হান সিদ্দিকী – চট্টগ্রাম কলেজ (দ্বাদশ শ্রেণি)
- মোহাম্মদ মারজুক রহমান – চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজ (একাদশ শ্রেণি)
- তাহসিন খান – আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ (একাদশ শ্রেণি)
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দলনেতা হিসেবে থাকবেন কোচ মাহবুবুল আলম মজুমদার, উপদলের নেতা হিসেবে থাকবেন একাডেমিক সমন্বয়ক অপূর্ব কুমার এবং পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকবেন সমন্বয়ক মো. বায়েজিদ ভূঁইয়া।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এবারের আইএমওর জন্য সারা দেশের ১৯ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫১ হাজার ৫৩২ শিক্ষার্থী অনলাইনে নিবন্ধন করে। প্রথমে অনলাইন বাছাই অলিম্পিয়াড, এরপর ১২টি শহরে আঞ্চলিক গণিত উৎসব এবং সেখানকার বিজয়ী প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় গণিত উৎসব। জাতীয় গণিত উৎসবে বিজয়ী ৮৭ জনের মধ্য থেকে সেরা ৪৮ জনকে নিয়ে জাতীয় গণিত ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়। সেই ক্যাম্পের ফলাফলের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে ছয় সদস্যের দল গঠন করা হয়।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি দেশে এই আয়োজন পরিচালনা করে আসছে।
উপস্থিত অন্যান্যরা
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গণিত বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সহসভাপতি আবদুল হাকিম খান, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সদস্য ও বুয়েটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিজওয়ানা রিয়াজ, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সদস্য ও ঢাকার সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সাবেক শিক্ষক প্রশিক্ষক রাজিয়া বেগম, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সদস্য ও টালিখাতার প্রধান নির্বাহী শাহাদাত উল্লাহ্ খান এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক হাসান উজ জামানসহ অনেকে।



