একসময় রাত নামলেই অন্য এক শহর হয়ে উঠত সদরঘাট। নদীর বুক চিরে ভেসে আসত লঞ্চের হর্ন, ঘাটজুড়ে থাকত মানুষের ঢল, কুলি-শ্রমিকদের ব্যস্ত পায়ের শব্দ আর যাত্রীদের কোলাহল। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার অন্যতম প্রধান ভরসা ছিল এই নদীপথ।
কিন্তু সময়ের স্রোত বদলে দিয়েছে অনেক কিছু। পদ্মা সেতু চালুর পর পাল্টে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা। কমেছে লঞ্চের যাত্রী, কমেছে অনেক রুটের ব্যস্ততা। একসময় যে ঘাটে দিন-রাত কর্মচাঞ্চল্য ছিল, সেখানে এখন অনেক শ্রমিকের চোখে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা।
তবুও জীবন থেমে থাকে না। নদীর ঢেউ যেমন থামে না, তেমনি থামে না সদরঘাটের মানুষগুলোর লড়াইও। এই লড়াইয়ের মাঝেই বিশ্বকাপ ফুটবল এলে বদলে যায় তাদের দিনের ক্লান্তি। কিছু সময়ের জন্য ভুলে যান কাজ কমে যাওয়ার চিন্তা, সংসারের হিসাব, ভবিষ্যতের ভয়। ফুটবল তাদের কাছে শুধু খেলা নয়, এটি কষ্টের জীবনে পাওয়া এক টুকরো আনন্দ।
সদরঘাটের লঞ্চ শ্রমিক আবদুল কাদের দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। নদীর পরিবর্তন তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। কাদের বলেন, “আগে সদরঘাটে যে ভিড় ছিল, এখন আর সেই অবস্থা নেই। আগে একের পর এক লঞ্চ আসত, কাজের শেষ ছিল না। এখন অনেক সময় বসে থাকতে হয়। কিন্তু বিশ্বকাপ এলে মনটা ভালো হয়ে যায়। রাতে খেলা দেখি, কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা ভুলে যাই।”
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক লঞ্চ কর্মচারী সেলিম মিয়ার কথাতেও উঠে আসে অনিশ্চয়তার গল্প। তিনি বলেন, “আমাদের জীবনটাই নদীর সঙ্গে বাঁধা। এই কাজ ছেড়ে কোথায় যাব? কিন্তু এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা হয়। ছেলে-মেয়েদের কথা ভাবি। তারপরও বিশ্বকাপ এলে মনে হয়, জীবনে এখনো আনন্দের কিছু সময় আছে।”
পদ্মা সেতুর পর দক্ষিণাঞ্চলের অনেক মানুষ সড়কপথে যাতায়াত করছেন। ফলে লঞ্চ ব্যবসায় এসেছে বড় পরিবর্তন। অনেক লঞ্চ বন্ধ হয়েছে, অনেক শ্রমিকের কাজ কমেছে। কেউ পেশা বদলেছেন, কেউ অন্য কাজ খুঁজছেন, আবার কেউ এখনো অপেক্ষা করছেন নদীপথের পুরোনো ব্যস্ততা ফিরে আসার আশায়।
কিন্তু বিশ্বকাপের রাতে সদরঘাটের চিত্র অন্যরকম। লঞ্চের ডেক, ঘাটের চায়ের দোকান কিংবা ছোট টেলিভিশনের সামনে জড়ো হন শ্রমিকরা। কেউ আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকায় মুগ্ধ, কেউ ব্রাজিলের হলুদ জার্সির ভক্ত। কেউ মেসির জাদুতে হারিয়ে যান, কেউ নেইমারের ফুটবল ভালোবাসেন।
লঞ্চ শ্রমিক রুবেল হোসেন বলেন, “আমরা সারাদিন নদীতে থাকি। আমাদের বিনোদনের সুযোগ খুব কম। বিশ্বকাপ এলে মনে হয় আমরাও পৃথিবীর বড় একটা উৎসবের অংশ। একটা ম্যাচ দেখি, সবাই মিলে কথা বলি এটাই অনেক আনন্দ।”
তাদের কাছে ফুটবলের গল্পও যেন নিজেদের জীবনের গল্প। আর্জেন্টিনার কঠিন পথ পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প তাদের মনে করিয়ে দেয় নিজেদের সংগ্রামের কথা। ব্রাজিলের আনন্দময় ফুটবল এনে দেয় ক্লান্ত শরীরে কিছুটা প্রাণ।
বয়স্ক লঞ্চ শ্রমিক মোতালেব মিয়া বলেন, “ফুটবল আর জীবন একই রকম। কখনো এগিয়ে থাকি, কখনো পিছিয়ে যাই। কিন্তু মাঠে যেমন শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়তে হয়, জীবনেও তেমন লড়াই করে যেতে হয়।”
সদরঘাটের নদী এখনো বয়ে চলে। লঞ্চ এখনো যাত্রী নিয়ে ছুটে যায়। কিন্তু আগের সেই ব্যস্ততা নেই। তবুও নদীর সঙ্গে যাদের জীবন বাঁধা, তারা স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি। বিশ্বকাপ তাদের সেই স্বপ্নের জায়গা। যেখানে একটি গোলের উল্লাস, একটি ম্যাচের উত্তেজনা কিংবা প্রিয় দলের জয়, কিছু সময়ের জন্য মুছে দেয় জীবনের কঠিন হিসাব।
লঞ্চের হর্ন হয়ত আগের মতো জোরে বাজে না। ঘাটে আগের মতো মানুষের ঢলও নেই। কিন্তু বিশ্বকাপের রাতে সদরঘাটের কোনো এক কোণে বসে থাকা শ্রমিকের চোখে এখনো জ্বলে ওঠে এক চেনা আলো। আনন্দের, আশার, আর আবারও লড়াই করে যাওয়ার।



