ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে পুলিশের হেনস্তা: সংস্কৃতির পরিবর্তন জরুরি
ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ওপর পুলিশি হেনস্তা: সংস্কার কতটা জরুরি

চট্টগ্রাম শহরের খুলশী থানায় ক্রিকেটার নাঈম হাসানের ওপর পুলিশের হেনস্তার ঘটনা শুধু একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটি আমাদের পুলিশি সংস্কৃতি, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার একটি উপলক্ষ।

ঘটনার বিবরণ

খবর অনুযায়ী, নাঈম হাসান বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে পুলিশের হাতে আটক হন। তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন, পরিচয়পত্র দেখিয়েছেন, স্থানীয় লোকজনও তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেছেন। তবু অভিযোগ উঠেছে যে তাঁকে মারধর করা হয়েছে, অপমান করা হয়েছে এবং থানায় নিয়ে গিয়ে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। পরে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

মূল প্রশ্ন

একজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার হওয়ার কারণে নাঈম হাসানের ঘটনা সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। ক্রিকেটপ্রেমীরা প্রতিবাদ করেছেন। বিসিবির কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। ফলে ঘটনাটি চাপা পড়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রতিদিন যেসব সাধারণ মানুষ পুলিশের হাতে অপমান, হয়রানি কিংবা অযৌক্তিক বল প্রয়োগের শিকার হন, তাঁদের কতজনের গল্প আমাদের সামনে আসে?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে একাধিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনেকের মধ্যে একটি আশা তৈরি হয়েছিল যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কার হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও সেই পরিবর্তনের অংশ হবে। জনগণের সঙ্গে আচরণে আরও মানবিকতা আসবে। ক্ষমতার প্রদর্শনের বদলে সেবার মানসিকতা জোরদার হবে। কিন্তু নাঈম হাসানের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে সেটি ইঙ্গিত দেয় যে পোশাক বদলানো যত সহজ, সংস্কৃতি বদলানো তত সহজ নয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পুলিশি সংস্কৃতির সমস্যা

সমস্যা হলো, আমাদের দেশে অনেক সময় পুলিশের একটি অংশ নিজেদের জনগণের সেবক নয়; বরং জনগণের ওপর কর্তৃত্বকারী শক্তি হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহ করা যেতে পারে, জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে, তল্লাশি চালানো যেতে পারে। কিন্তু আইনের শাসন মানে হলো প্রতিটি পদক্ষেপ আইন ও পদ্ধতি মেনে করা। কাউকে অপরাধী প্রমাণের আগেই অপরাধীর মতো আচরণ করা আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নাঈম হাসানের দাবি অনুযায়ী তিনি বারবার নিজের পরিচয় দেওয়ার পরও তা গুরুত্ব পায়নি। এখানে বিষয়টি ক্রিকেটার পরিচয়ের নয়। বিষয়টি হলো, একজন নাগরিক তাঁর পরিচয় দেওয়ার পরও কেন তাঁকে সম্মানের সঙ্গে আচরণ করা হবে না? রাষ্ট্রের চোখে একজন নাগরিকের মর্যাদা কি তাঁর পরিচিতি বা প্রভাবের ওপর নির্ভর করবে?

প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার

এ ধরনের ঘটনার পর সাধারণত কয়েকজন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়, তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, তারপর জনমতের চাপ কমে গেলে বিষয়টি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। কিন্তু প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে কেবল ব্যক্তিগত শাস্তি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার। প্রয়োজন এমন একটি পুলিশি ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যেখানে নাগরিকের অধিকারকে দুর্বলতা নয়, রাষ্ট্রের শক্তি হিসেবে দেখা হবে।

নাঈম হাসানের ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল যে বাংলাদেশে পুলিশ সংস্কারের প্রশ্ন এখনো শেষ হয়ে যায়নি; বরং এটি আগের মতোই প্রাসঙ্গিক। জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন অনেক মানুষ দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আচরণগত ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন।

কারণ, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন নাগরিক। তিনি ক্রিকেটার, শিক্ষক, সাংবাদিক, শ্রমিক কিংবা রিকশাচালক যা–ই হোন না কেন, আইনের চোখে তাঁর মর্যাদা সমান হওয়ার কথা। সেই নীতিই যদি বাস্তবে নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে পরিবর্তনের দাবি কাগজে থাকবে, মানুষের জীবনে নয়।