অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশ দলের হতাশাজনক পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা চলছে সর্বত্র। বোলিং ও ব্যাটিং— দুই বিভাগেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সিরিজজুড়ে চাপে ছিল স্বাগতিকরা। ওয়ানডে সিরিজে দাপুটে পারফরম্যান্সের পর টি-টোয়েন্টিতে এসে কেন এমন ছন্দপতন ঘটল, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সিরিজের শেষ ম্যাচে বড় ব্যবধানে হার
চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ ৭ উইকেটের বড় ব্যবধানে হেরে যায় অস্ট্রেলিয়ার কাছে। প্রথম দুই ম্যাচে কিছুটা হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলেছিল। তবে হোয়াইটওয়াশ এড়ানোর শেষ সুযোগেও দল দেখাতে পারেনি কাঙ্ক্ষিত লড়াই। ফলে ন্যূনতম প্রতিরোধ ছাড়াই সিরিজের শেষ ম্যাচেও পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাওহিদ হৃদয়ের দলকে।
মেহেদীর মন্তব্য: ব্যাটারদের ব্যর্থতাই মূল কারণ
সিরিজের শেষ দুই ম্যাচে একাদশের বাইরে থাকা স্পিনিং অলরাউন্ডার শেখ মেহেদী তৃতীয় ম্যাচের পর টি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দলের পারফরম্যান্স নিয়ে খোলামেলা মন্তব্য করেছেন। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ২৯ রানে অপরাজিত থাকা এই ক্রিকেটারের মতে, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা ছিল ব্যাটারদের ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও ছন্দহীনতা।
মেহেদীর বিশ্বাস, ব্যাটিং বিভাগ প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে না পারায় দল পুরো সিরিজজুড়েই চাপে ছিল। তার মতে, ভালো সংগ্রহ গড়ে তুলতে না পারলে আন্তর্জাতিক মানের দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাও কঠিন হয়ে পড়ে, আর সেটিই এই সিরিজে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে।
বাংলাদেশের সমস্যাটা আসলে কোথায়? এমন প্রশ্নে টি স্পোর্টসকে মেহেদী বলেন, “দলের সমস্যা এটা বলব না। আসলে ব্যাটসম্যানরা ফর্মে থাকলে খেলার সিনারিওটা অন্যরকম হতো। যেহেতু তিনটা ম্যাচের ভেতর ব্যাটসম্যানরা একটাতে ভালো একটা স্টার্ট দিয়েছে, বাকি দুইটাতে দেয়ই নাই। আমার মনে হয় এইখানটাতে আমরা একটু পিছিয়ে গেছি। ব্যাটসম্যানরা যদি ফর্মে থাকত, সিরিজটা হয়তোবা ভালো হতো।”
প্রথম ম্যাচে সেরা পারফরম্যান্সের পর বাদ
প্রথম ম্যাচ ব্যাট হাতে ২২ বলে ২৯ করার পর বল হাতে ৪ ওভারে ৭.২৫ ইকোনোমিতে একটি উইকেট নেন মেহেদী। দলের পক্ষে সবচেয়ে বেশি রান করেছিলেন। কিন্তু পরের দুটো ম্যাচে তাকে বাদ দেওয়া হয়।
এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ আছে কি না তা জানতে চাইলে মেহেদী বলেন, “আক্ষেপ তো প্রতিনিয়ত করে। দেখেন ক্রিকেটার হিসেবে আমি শুধু টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেই খেলি। কিন্তু সেখানেও আমি নিয়মিত সুযোগ পাই না। দেখা যায় সবসময় দলগত কম্বিনেশন কিংবা ম্যাচ-আপের মারপ্যাঁচে আমাকে বাদ পড়তে হয়। একজন খেলোয়াড় হিসেবে বিষয়টা আমার জন্য সত্যিই খুব হতাশাজনক। আমি যদি নিয়মিত খেলার সুযোগ পেতাম, তাহলে হয়তো বর্তমানে যে ধরনের পারফর্ম করছি, তার চেয়ে আরও অনেক ভালো করার সুযোগ থাকত আমার।”
বোলারদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ
দলে নিয়মিত সুযোগ না পেয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন মেহেদী। এই অলরাউন্ডারের মতে ব্যাটাররা ছন্দে ফেরার জন্যে নিয়মিত সুযোগ পেলেও বোলারদের ক্ষেত্রে ‘বৈষম্য’ করা হচ্ছে। মেহেদীর ভাষায়, “আপনারা হয়তো বা জানেন, আর এটা সবাই জানে যে আমি নিয়মিত ক্রিকেট খেলার সুযোগ পাই না। একটা বিষয় খেয়াল করে দেখুন, বাংলাদেশে একজন ব্যাটার যেভাবে টানা সুযোগ পায়, একজন বোলার হিসেবে কিন্তু কেউ সেভাবে সুযোগ পায় না। আপনি যদি আমাদের বাংলাদেশের সেরা দুজন টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানের কথা ভাবেন, আপনারা কিন্তু কখনোই তাদের দল থেকে ড্রপ করবেন না। তাহলে বাংলাদেশের সেরা দুজন বোলারের ক্ষেত্রে কেন এমনটা হবে না? যাদের মধ্যে একজন প্রায় আমি নিজেই। আপনি যদি ইকোনমি রেট দেখেন, বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে সবথেকে কম ইকোনমি কিন্তু আমার। অথচ এরপরেও আমি দলে নিয়মিত নই। ব্যাটসম্যানদের ক্ষেত্রে যে নিয়মটা খাটছে, বোলারদের বেলায় ঠিক তার উলটোটা হচ্ছে। আমি আসলেই জানি না এমনটা কেন হচ্ছে।”
সহ-অধিনায়কত্ব থেকে বাদ দেওয়া নিয়েও হতাশা
হঠাৎ দলের সহ-অধিনায়কত্ব থেকে বাদ দেওয়া নিয়েও মুখ খুলেন মেহেদী। ৩১ বছর বয়সী অলরাউন্ডার জানেনই না কেন তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, “আসলে এই ব্যাপারটা দেখুন— আমাকে যখন সহ-অধিনায়ক (ভাইস-ক্যাপ্টেন) করা হলো, তখনও আমি কিছুই জানতাম না; আবার যখন সেই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো, তখনও আমাকে কিছু জানানো হয়নি। সহ-অধিনায়ক হিসেবে আমি যখন প্রথম সিরিজ খেলতে গেলাম, সেখানে হয়তো একটা ম্যাচে আমি খারাপ পারফর্ম করেছিলাম। কিন্তু এরপরের ম্যাচেই আমাকে দল থেকে ড্রপ করা হয়! এই সিদ্ধান্তটা আমার জন্য খুবই হতাশাজনক ছিল যে, তারা আসলে কেন আমার সাথে এমনটা করল? আমি সত্যিই জানি না।”
মেহেদী আরও বলেন, “আপনি অন্য যেকোনো দলের দিকে তাকিয়ে দেখুন, কোনো দলের সহ-অধিনায়ক কিন্তু কখনো এক ম্যাচ খারাপ করলেই দলের বাইরে চলে যায় না। একমাত্র আমাদের দেশেই এই ধরণের সমস্যাগুলো দেখা যায়। তারা কী কারণে এমনটা করেছে আমি জানি না, তবে সহ-অধিনায়ক থাকা অবস্থাতেও আমাকে অনেক ম্যাচে সাইডবেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছে।”
মানসিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
দলে এমন অনিশ্চয়তা আর বারবার উপেক্ষিত হওয়ার নেতিবাচক প্রভাব যে তার মানসিকতায় পড়ছে, সেটিও অকপটে স্বীকার করলেন এই ক্রিকেটার, “একজন খেলোয়াড়ের জন্য এ পরিস্থিতিগুলোতে মানসিকভাবে শক্ত থাকা ভীষণ কঠিন হয়ে পড়ে। তখন চ্যালেঞ্জটা আরও অনেক বেড়ে যায়— পরবর্তী ম্যাচগুলোতে আমি কীভাবে কামব্যাক করব, সবসময় মাথায় সেই চিন্তাই ঘুরপাক খেতে থাকে। আমি জানি না ভবিষ্যতে আসলে কী হতে চলেছে।”



