সব জল্পনা-কল্পনা ও নজিরবিহীন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল পেরিয়ে অবশেষে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচ খেলতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছেছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। রবিবার (১৪ জুন) মেক্সিকোর টিজুয়ানা বেস ক্যাম্প থেকে একটি সংক্ষিপ্ত ফ্লাইটে লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে ইরান দল। খবর রয়টার্স।
ভিসা বিধিনিষেধের মধ্যেই আগমন
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ম্যাচের দিনই মার্কিন মাটিতে প্রবেশ ও প্রস্থানের কঠোর ভিসা বিধিনিষেধের শর্ত মেনেই সোমবারের (১৫ জুন) উদ্বোধনী ম্যাচের ঠিক আগের দিন লস অ্যাঞ্জেলেসে পা রাখলো ‘টিম মেল্লি’ (ইরান জাতীয় দলের ফার্সি নাম)। বিমানবন্দর থেকে নামার পর কড়া পুলিশি পাহারায় খেলোয়াড়দের নির্ধারিত হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সোমবার লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ইরান তাদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে, যা দুই দেশের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম বিশ্বকাপ দ্বৈরথ।
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পটভূমি
তবে এই ম্যাচের ব্যাকগ্রাউন্ডে জড়িয়ে আছে তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হওয়ার পর এই প্রথম কোনও স্বাগতিক দেশ এমন একটি দলকে স্বাগত জানাচ্ছে, যাদের সঙ্গে তারা সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে।
মেক্সিকোতে উষ্ণ সংবর্ধনা
আমেরিকায় পা রাখার আগে মেক্সিকোর টিজুয়ানায় কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা থেকে ক্যাম্প সরিয়ে মেক্সিকোতে আশ্রয় নেওয়া ইরান দলকে বিদায় জানাতে হোটেলের সামনে ভিড় করেছিলেন হাজারো মেক্সিকান সমর্থক। ফুটবলাররা যখন বাসে উঠছিলেন, তখন চারদিক থেকে স্লোগান ওঠে ‘টিম মেল্লি’।
অনেক মেক্সিকান সমর্থক এসময় হলুদ রঙের প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরেন, যাতে লেখা ছিল— ‘ইরান, তোমরা একা নও। মেক্সিকো তোমাদের পাশে আছে’। গগনবিদারি কণ্ঠে স্প্যানিশ ভাষায় সমর্থকরা গাইতে থাকেন, ‘ইরান, ভাই আমার, তোমরা এখন মেক্সিকান’। মেক্সিকানদের এমন আবেগঘন ও উষ্ণ বিদায়কে হাসিমুখে হাত নেড়ে এবং নিজেদের ফোনে ভিডিও ধারণ করে ফ্রেমবন্দী করে নেন মেহেদি তারেমিরা।
লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভ
টিজুয়ানার সেই ভালোবাসার আবহ লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছাতেই রূপ নেয় তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনায়। ইরান দল যখন ক্যালিফোর্নিয়ায় নামছে, ঠিক তখনই লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামের বাইরে জড়ো হয়ে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন বহু প্রবাসী ইরানি-আমেরিকান।
বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল ‘ইরানে কোনও শাহ বা মোল্লাতন্ত্র নয়— ইরানিদের মাধ্যমেই শাসন পরিবর্তন’ সংবলিত প্ল্যাকার্ড। এছাড়া গত জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিহত হাজার হাজার তরুণ আন্দোলনকারী ও ক্রীড়াবিদদের ছবি ইনগেলউডের রাস্তায় প্রদর্শন করা হয়। বিক্ষোভ সমাবেশে অংশ নেওয়া ৫৬ বছর বয়সী ইরানি-আমেরিকান মোজগান রামেযানী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ইরান সরকার তাদের নিজস্ব জনগণকেই জিম্মি করে রেখেছে।” অপরদিকে ৭০ বছর বয়সী হাসান হাদ্দাদি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “পশ্চিমা বিশ্ব যেন শুধু নিন্দার ঝড় না তুলে ইরানের এই স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটাতে কার্যকর কিছু করে।”
প্রবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইরানি প্রবাসী জনগোষ্ঠীর শহর লস অ্যাঞ্জেলেস। ফলে সোমবার যখন স্টেডিয়ামে ফুটবলাররা নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে বুটজোড়া পায়ে লড়াইয়ে নামবেন, তখন গ্যালারিতে যে মাঠের বাইরের যুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।



