বরিশালে বাসদের 'মানবতার ঈদ উৎসব': ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষের মাঝে আনন্দ ভাগাভাগি
ঈদের উৎসব মানে শুধু নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক মহৎ উদ্যোগ দেখিয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। বরিশালে ষষ্ঠবারের মতো আয়োজিত 'মানবতার ঈদ উৎসব'-এ ভাসমান শিশু, ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে, যা সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
উৎসবের বিস্তৃতি ও প্রস্তুতি
ঈদের দিন সকালে বরিশাল নগরের ফকিরবাড়ি সড়কে অবস্থিত জেলা বাসদ কার্যালয়ে এই আয়োজন শুরু হয়। সেখানে শুভেচ্ছা বিনিময় ও আপ্যায়ন অনুষ্ঠানে শতাধিক শ্রমজীবী মানুষ অংশ নেন। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আয়োজনটি শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বেলা একটায় শুরু হয়ে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত চলে রান্না করা খাবার বিতরণের কর্মসূচি।
এই মানবিক উদ্যোগ শুধু একটি স্থানে সীমাবদ্ধ না থেকে শহরের কাউনিয়া এলাকার একটি বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে শতাধিক বৃদ্ধ নারী-পুরুষের হাতে খাবার তুলে দেওয়া হয়। এরপর বাসদের নেতা-কর্মীরা নদীবন্দর, ভাটার খাল, সদর রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। সেখানে দুই শতাধিক পথশিশু, ভবঘুরে এবং আরও দুই শতাধিক অসচ্ছল মানুষের মধ্যে পোলাও, রোস্ট, ডিম ও সেমাই বিতরণ করা হয়।
স্বেচ্ছাশ্রম ও অংশগ্রহণ
এই আয়োজনের পেছনে ছিল কয়েক দিনের প্রস্তুতি। গত শুক্রবার রাত থেকেই রান্নার কাজ শুরু হয়, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও আয়োজকেরা থেমে থাকেননি। ছাত্র ফ্রন্ট, শ্রমিক ফ্রন্ট এবং বাসদের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন। বাবুর্চি কাওসার হোসেন বলেন, 'ঈদের আগের দিন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ থাকলেও কয়েক বছর ধরে স্বেচ্ছায় এই কাজে যুক্ত হয়েছি। শ্রমজীবী ও দুস্থ মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করতে পারায় সত্যিই অন্য রকম এক ভালো লাগা কাজ করে।'
ছাত্র ফ্রন্টের জেলা সদস্য মো. রাকিব জানান, কয়েক বছর ধরে এই উদ্যোগে যুক্ত থেকে মানবতার জন্য কাজ করার একধরনের তৃপ্তি অনুভব করছেন তাঁরা।
নেতাদের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
দিনভর এই কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক মনীষা চক্রবর্তী, কেন্দ্রীয় বর্ধিত ফোরামের সদস্য ইমাম হোসেন, জেলা শাখার সদস্য শহিদুল শেখ, বেল্লাল গাজী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট বরিশাল মহানগর শাখার আহ্বায়ক সুজন আহমেদ এবং সদস্যসচিব ফারজানা আক্তার প্রমুখ।
মনীষা চক্রবর্তী জানান, ছয় বছর ধরে ঈদের দিন তাঁরা এই মানবতার ঈদ উৎসবের আয়োজন করছেন। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, এমন উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে হওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, ঈদসহ সব উৎসবে অসচ্ছল মানুষের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ থাকা জরুরি এবং তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করা উচিত।
ভবিষ্যতেও এই আয়োজন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে মনীষা বলেন, এর পরিধি আরও বাড়ানো হবে, যাতে সমাজের আরও বেশি মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া যায়। একই সঙ্গে যাঁরা স্বেচ্ছাশ্রম ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
মানবিক আবেদন ও প্রতিক্রিয়া
লঞ্চঘাট এলাকায় খাবার পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ভবঘুরে আলতাফ হোসেন। তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতা—'ঈদের দিন সবাই ভালোমন্দ খায়। আমাগো তো হেইয়্যা খাওনের সামর্থ্য নাই। তবু হ্যারা (বাসদ) মোগো কষ্টের কতা মনে কইর্যা ভালোমন্দ খাওন দিছে। না পাইলে ঈদের দিনও না খাইয়া থাহন লাগত।'
বরিশালের এই ছোট্ট উদ্যোগ তাই শুধু একটি দিনের আয়োজন নয়, এটি হয়ে উঠেছে সহমর্মিতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা আর মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়।



